বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে হৃদরোগ বা হার্ট অ্যাটাকের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং বংশগত কারণে ৪০ বছরের কম বয়সীরাও এখন হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। অথচ এক প্রজন্ম আগেও তরুণদের মধ্যে এই রোগ দেখা যেত না।
চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত ধূমপান, শারীরিক পরিশ্রম না করা, কম ঘুমানো এবং শরীরের ওজন বেড়ে যাওয়া এই সমস্যার বড় কারণ।
স্বাস্থ্য সংস্থা কার্ডিও মেটাবলিক ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি পাঁচজন হৃদরোগীর মধ্যে একজনের বয়স ৪০ বছরের নিচে।
রাজধানী ঢাকায় ৩৪ বছর বয়সে হার্ট অ্যাটাক হওয়া অজিত বড়ুয়া জানান, সাত মাস আগে তিনি প্রথম এই সমস্যায় পড়েন। এক বছর আগে বাবা হওয়ার পর তার জীবনের রুটিন বদলে যায়। অফিসের কাজের পর রাতে সন্তানের জন্য তাকে জেগে থাকতে হতো। এতে তার শরীর খুব অস্থির হয়ে পড়ে। একদিন সকালে অফিসের জন্য তৈরি হওয়ার সময় তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন। আগে তাকে কোনো ওষুধ খেতে হতো না, কিন্তু এখন প্রতিদিন আট থেকে নয়টি ওষুধ খেতে হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বর্তমানে পৃথিবীতে মৃত্যুর প্রধান কারণ হৃদরোগ। প্রতি বছর প্রায় এক কোটি ৭৯ লক্ষ মানুষ হৃদরোগে মারা যায়।
ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে চার ভাগের তিন ভাগ মানুষের মৃত্যু হয় হার্ট অ্যাটাকের কারণে। বাংলাদেশে এই মৃত্যুর হার ১৪ দশমিক ৩১ শতাংশ। গত ১০ বছরে হার্ট অ্যাটাকের হার পুরুষদের মধ্যে ৩৫ গুণ এবং নারীদের মধ্যে ৪৮ গুণ বেড়েছে।
চিকিৎসকরা এখন হাসপাতালে অনেক কম বয়সী রোগী দেখছেন। ল্যাবএইড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এ.এম. শামীম বলেন, ‘এখন আমরা ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়সী অনেক রোগী পাচ্ছি, যা ২০ বছর আগেও দেখা যেত না।’ তিনি জানান, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা, ক্যারিয়ারের প্রতিযোগিতা এবং কাজের চাপ এই রোগের অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়া এশীয় অঞ্চলের মানুষের হৃদপিণ্ডের রক্তনালী বা ধমনী সরু হওয়ায় তাদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিও বেশি থাকে।
বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ডা. এস এম মোস্তফা জামান জানান, এক গবেষণায় দেখা গেছে যে বাংলাদেশে ৩৫ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে হৃদরোগের ঘটনা অন্য দেশের তুলনায় ১৭ গুণ বেশি। তবে তিনি একটি ভালো দিকও বলেন যে, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। আগে প্রচণ্ড ব্যথা না হলে কেউ হাসপাতালে আসত না। এখন সামান্য বুকব্যথা হলেও মানুষ ডাক্তার দেখান।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, সুস্থ থাকার জন্য নিয়ম মেনে চলা জরুরি। ডা. শামীম পরামর্শ দিয়ে বলেন, সবাইকে সুষম খাবার খেতে হবে, নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে এবং পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে। যাদের পরিবারে বাবা বা দাদারা কম বয়সে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন, তাদের আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ৩০ বছর বয়সের পর প্রত্যেকেরই বছরে অন্তত একবার শরীর পরীক্ষা করানো দরকার। তরুণদের মধ্যে এই রোগের হার আরও বাড়তে থাকলে তা দেশের জন্য বড় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।


