ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ তৃতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। এই সংঘাতের প্রভাবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশসহ সকল সমুদ্র পাড়ের রাষ্ট্রগুলোর জন্য এক কঠিন বাস্তব শিক্ষা দিচ্ছে।
বিভিন্ন পর্যক্ষেনে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনী হওয়া সত্ত্বেও এই সংকীর্ণ ও বিতর্কিত জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বব্যাপী তেল শিল্পের পক্ষ থেকে ট্যাঙ্কারগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে পার করে দেওয়ার বারবার অনুরোধ এলেও মার্কিন নৌবাহিনী তাতে সাড়া দিতে পারছে না। এর কারণ হিসেবে তারা ইরানের নৌ–মাইন, দ্রুতগামী ছোট রণতরী, ড্রোন এবং উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছে।
অত্যাধুনিক বিমানবাহী রণতরী এবং মিত্রশক্তির উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও মাত্র ৩৩ কিলোমিটার প্রশস্ত এই প্রণালীটি এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। এটি আধুনিক যুদ্ধের এক বড় পরিবর্তনকে সামনে এনেছে—যেখানে কেবল নৌ–শক্তির শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেই সমুদ্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
আমদানিনির্ভর বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতির প্রভাব অত্যন্ত তাৎক্ষণিক। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খোরশেদ আলম এ বিষয়ে বলেন, “শিক্ষাটি পরিষ্কার। আধুনিক যুদ্ধের পরিবেশে বড় আকারের জাহাজগুলো ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে, বিশেষ করে সংকীর্ণ বা জনাকীর্ণ জলসীমায়।” বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা পারস্য উপসাগর থেকে ভিন্ন হলেও যুদ্ধের সময় আমাদের প্রধান সমুদ্রপথ, বন্দর এবং উপকূলীয় চ্যানেলগুলো একই ধরনের হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, প্রতিবেশী মিয়ানমার বা অন্য কোনো বড় শক্তির সঙ্গে দ্বন্দ্বে কেবল প্রথাগত বড় জাহাজের ওপর নির্ভরতা আমাদের বিপদে ফেলতে পারে। কারণ এসব সম্পদ ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং পানির নিচ থেকে আক্রমণের সহজ লক্ষ্যবস্তু।
নৌ–যুদ্ধের পুরনো তত্ত্ব অনুযায়ী এতদিন বড় বড় যুদ্ধজাহাজ দিয়ে সমুদ্র নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেওয়া হতো। বাংলাদেশও সেই ধারায় ফ্রিগেট বা বড় যুদ্ধজাহাজে বড় বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু বর্তমান সংঘাত বলছে, একটি সস্তা নৌ–মাইন একটি বিলিয়ন ডলারের রণতরীকে অচল করে দিতে পারে।
রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) খোরশেদ আলমের মতে, “বঙ্গোপসাগরকে এখন আর বড় নৌবহরের জন্য নিরাপদ জায়গা ভাবার সুযোগ নেই।” এটি এখন একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ উপকূলীয় পরিবেশে পরিণত হচ্ছে, যেখানে বড় জাহাজের চেয়ে ভৌগোলিক অবস্থান এবং বিশেষ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের উচিত নিজস্ব ভূ–প্রকৃতি অনুযায়ী আরও সাশ্রয়ী ও রক্ষণাত্মক কৌশল গ্রহণ করা। চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ী বন্দরের নিরাপত্তা, সুন্দরবনের কাছের গভীর এলাকা ‘সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড‘ পর্যবেক্ষণ এবং বিকল্প নৌপথ সচল রাখা এখন সবচেয়ে জরুরি। রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) খুরশেদ আলম সতর্ক করে বলেন, আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার কারণে বড় জাহাজগুলোকে সারাক্ষণ ট্র্যাক করা যায়। ফলে এগুলো এখন সম্পদের চেয়ে আপদ বা ‘লায়াবিলিটি‘ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
তিনি বাংলাদেশের বিনিয়োগের অগ্রাধিকার পুনর্মূল্যায়নের তাগিদ দিয়ে বলেন, বড় জাহাজের বদলে আক্রমণকারী সাবমেরিন, দূরপাল্লার মিসাইল সিস্টেম, মাইন বসানোর সক্ষমতা এবং আন্ডারওয়াটার ড্রোনের পেছনে অর্থ ব্যয় করা উচিত।
তিনি বলেন, “আমরা যত বড় প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছি, সেগুলো শত্রুর তত বড় লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছে। যুদ্ধের প্রথম আঘাতেই বিলিয়ন ডলারের সম্পদ হারানোর ঝুঁকি বাংলাদেশ নিতে পারে না।“
বিশ্লেষকরা আমাদের দ্বীপগুলোকে ‘অডুবন্ত রণতরী‘ হিসেবে গড়ে তোলার পরামর্শ দিচ্ছেন, যেখানে মিসাইল ও রাডার বসিয়ে সাশ্রয়ী উপায়ে দেশের সমুদ্রসীমা রক্ষা করা যাবে।
হরমুজ প্রণালীর এই সংকট বিশ্ব সামরিক প্রেক্ষাপটের সেই পরিবর্তনকেই তুলে ধরছে যেখানে প্রথাগত বড় আয়োজনের চেয়ে ছোট কিন্তু প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত ব্যবস্থাগুলো বেশি কার্যকর হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়া এখন আর ঐচ্ছিক ব্যাপর নয়। রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) খুরশেদ আলমের ভাষায়, “ভুল সংশোধনের সময় এখনই।” অনিশ্চিত ভবিষ্যতে সামুদ্রিক স্বার্থ রক্ষা করতে হলে প্রথাগত নৌ–বিলাসিতা ছেড়ে আধুনিক ও কার্যকরী কৌশলের দিকেই বাংলাদেশকে ঝুঁকতে হবে।


