ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের (ইবিএল) চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী চৌধুরী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে ৮ হাজার কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ বিভাগ এ অভিযোগগুলো তদন্ত করছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, শওকত আলী চৌধুরীর পরিবার জাহাজ ভাঙার ব্যবসার আড়ালে শেল কোম্পানির মাধ্যমে বিদেশে অর্থপাচার করেছেন। এর মধ্যে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম তদন্ত শুরুর বিষয়টি টাইমস অব বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছেন।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর ও ৮ অক্টোবর দুটি পৃথক চিঠির মাধ্যমে আইনজীবী কামরুল ইসলাম দুদকে অভিযোগ করেন। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে শওকত আলী ও তার পরিবারের নামে থাকা ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক পরিমাণ অর্থ লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথা চিঠিতে উল্লেখ করেন এই আইনজীবী।
দুদকের যাচাই কমিটি অভিযোগগুলো প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে এখন আনুষ্ঠানিকভাবে অনুসন্ধান শুরু করেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, শওকত আলী ও তার পরিবার ১৪৬টি করপোরেট অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিপুল অর্থ লেনদেন করেছেন। বিএফআইইউর তথ্যমতে, তদন্ত শুরু হওয়ার পর তারা বিদেশি সম্পদ বিক্রির উদ্যোগ নেন। আইনজীবীর দাখিল করা নথি অনুযায়ী, দুবাইয়ের তিলাল আল ঘাফ এলাকার লানসি আইল্যান্ডে অবস্থিত প্রায় ৩০০ কোটি টাকার একটি বিলাসবহুল ভিলা বিক্রির জন্য তোলা হয়েছে।
আবেদনকারী ওই সম্পদ জব্দ করার ও বিদেশে অর্থ স্থানান্তর রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, শওকত আলী ইবিএলে ১৫ শতাংশ শেয়ারধারী, যা ব্যাংক কোম্পানি আইনে নির্ধারিত ১০ শতাংশ সীমা অতিক্রম করেছে। আরও ৫ শতাংশ শেয়ার তিনি কয়েকটি শেল কোম্পানির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
চিঠিতে বলা হয়, পরিবারের ১৮৭টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৮০৭ কোটি টাকা।
বিএফআইইউর খসড়া প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে শওকত আলী, তাঁর স্ত্রী তাসমিয়া আমবারিন, মেয়ে জারা নামরিন ও ছেলে জারান শওকত আলী চৌধুরী ২৮টি ব্যাংকে ১৮৭টি অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করেছেন। জুন ২০২৪ পর্যন্ত এসব অ্যাকাউন্টে মোট ৮ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা জমা পড়েছে এবং ৮ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
অভিযোগকারী বিএফআইইউ’র বরাতে বলেছেন, শওকত আলীর শিপিং কোম্পানি এসএন করপোরেশনের নামে খোলা একাধিক এলসিতে অসংগতি পাওয়া গেছে। এসব এলসি ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে নিবন্ধিত কিছু কোম্পানির নামে খোলা হয়, যেগুলোর ঠিকানা এক এবং কার্যক্রম যাচাইযোগ্য নয়, যা বাণিজ্যিক আড়ালে অর্থ পাচারের ইঙ্গিত দেয়।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস বর্তমানে অর্থ পাচারের স্বর্গভূমি। এ কারণে ব্রিটিশ এই দ্বীপরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া শওকতের লেনদেনগুলো সন্দেহজনক মনে করছে বিএফআইইউ।
চিঠি অনুযায়ী এক ঘটনায় বিএফআইইউ দেখতে পায়, শওকতের ঢাকা ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে গত ১৩ বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। একই সময়ে ইবিএলের কোম্পানি সচিব তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে ১২৫ বার নগদ উত্তোলন করেছেন, যা ক্ষমতার অপব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়।
জারা নামরিন ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে ইবিএলের আগ্রাবাদ শাখার অ্যাকাউন্টে ৩১ কোটি টাকা জমা দিয়ে পরে ৩০ কোটি টাকা অন্য এক অ্যাকাউন্টে ক্লিয়ারিং চেকের মাধ্যমে স্থানান্তর করেন।
অন্যদিকে, শওকতের ছেলে জারান এসএন করপোরেশনের অর্থ ব্যবহার করে রয়্যাল ক্যাপিটালের মাধ্যমে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেন, যদিও নথিতে নিজেকে ‘বেকার’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।
মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী বিএফআইইউ ২০২৫ সালের ১ জুলাই শওকত আলী ও তার পরিবারের সব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করে।
এ বিষয়ে শওকত আলী চৌধুরীর সঙ্গে মন্তব্যের জন্য একাধিকবার একাধিক মাধ্যমে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।


