দ্রুত সম্প্রসারণের এক নতুন ধাপে প্রবেশ করছে ভারতের সামুদ্রিক খাত। এর অংশ হিসেবে দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড ভারতের বন্দরে লজিস্টিকস ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে অতিরিক্ত পাঁচ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত তিন দশকে কোম্পানিটি ভারতে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এর সঙ্গে এই নতুন ঘোষণা দেখিয়ে দিচ্ছে ভারত তার বন্দর ও সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থা আধুনিক করার জন্য কতটা আগ্রহ নিয়ে আন্তর্জাতিক বন্দর অপরেটরদের চেয়েছে।
এর বিপরীতে বাংলাদেশ নীতিগত বিতর্ক এবং থমকে যাওয়া সংস্কারের মাঝেই আটকে আছে। বছরের পর বছর ধরে আন্তর্জাতিক অপারেটরদের চট্টগ্রাম বন্দরে আনার সরকারি আলোচনা সত্ত্বেও কোনো বড় অগ্রগতি হয়নি। এই বন্দরটি বাংলাদেশের ৯০ শতাংশেরও বেশি বৈদেশিক বাণিজ্য এবং প্রায় ৯৮ শতাংশ কন্টেইনার সামলায়। তবুও এটি বৈশ্বিক র্যাঙ্কিং এবং পরিচালনগত দক্ষতায় আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে।
বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ে দুই প্রতিবেশীর পার্থক্য
ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক–এস অ্যান্ড পি গ্লোবাল-কন্টেইনার পোর্ট পারফরম্যান্স ইনডেক্স ২০২৩-এ দুই প্রতিবেশীর মধ্যকার বৈসাদৃশ্য স্পষ্ট। যেখানে ভারতের নয়টি বন্দর বিশ্বের শীর্ষ ১০০-এর মধ্যে স্থান পেয়েছে, সেখানে বিশ্বের ৪০৫টি বন্দরের মধ্যে ৩৩৭তম স্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অবস্থানটি বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রতিযোগিতাকে আটকে রাখা কাঠামোগত অদক্ষতার প্রতীক।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের নতুন পরিকল্পনা, যা অক্টোবর ২০২৫-এ প্রকাশিত হয়েছে, তার লক্ষ্য হল কন্টেইনার টার্মিনাল, মাল্টিমোডাল পরিবহন করিডোর, লজিস্টিকস পার্ক, ওয়্যারহাউজিং হাব এবং ডিজিটাল অটোমেশন সিস্টেম জুড়ে একটি সমন্বিত সাপ্লাই-চেইন নেটওয়ার্ক তৈরি করা। ডিপি ওয়ার্ল্ড ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলজুড়ে পাঁচটি কন্টেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করে।
ভারতের লজিস্টিকস কৌশল ও দক্ষতা বৃদ্ধি
ভারতের বৃহত্তর লজিস্টিকস কৌশল তৈরি হয়েছে সংস্কার এবং দ্রুত প্রযুক্তির উন্নয়নের ওপর ভিত্তি করে। সরকারি তথ্য অনুসারে, দেশটির ১২টি রাষ্ট্র-পরিচালিত প্রধান বন্দরে গড় জাহাজ টার্নঅ্যারাউন্ড সময় বা বন্দরে এসে কাজ শেষ করে চলে যাওয়ার সময় ২০১৩-১৪ সালের ৯৩ দশমিক ৫৯ ঘণ্টা থেকে ২০২৩-২৪ সালে ৪৮ দশমিক শূন্য ৬ ঘণ্টায় নেমে এসেছে। ভারতের কর্তৃপক্ষ বলছে, এখন বেসরকারি অংশগ্রহণ এবং অটোমেশন বৃদ্ধির কারণে জাতীয় গড় আরও কম–‘একদিন এরও নিচে’।
বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ে ষ্পষ্ট দৃশ্যমান ভারতের এই উন্নতি। র্যাঙ্কিংয়ে বিশাখাপত্তম ১৯তম, মুন্দ্রা ২৭তম এবং পিপাভাভ, কামারাজার, কোচিন, হাজিরা, কৃষ্ণাপত্তম, চেন্নাই ও জওহরলাল নেহরু বন্দর রয়েছে শীর্ষ ১০০-এর মধ্যে।
চট্টগ্রামের দুর্বল কর্মক্ষমতা
অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে দুর্বল রয়ে গেছে চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মক্ষমতা। এখানে গড় জাহাজ টার্নঅ্যারাউন্ড সময় ৩ দশমিক ২৩ দিন বা ৭৭ দশমিক ৫ ঘণ্টা, যা ভারতের প্রধান বন্দরগুলোর গড়ের চেয়ে প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি। আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন অনুসারে, চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানিকৃত পণ্য ছাড় করতে প্রায় ১১ দিন সময় লাগে। রপ্তানি-সম্পর্কিত কাজ প্রতিপালনে প্রয়োজন হয় ৩৬ ঘণ্টা।
চট্টগ্রাম বন্দর ২০২৪ সালে ৩ দশমিক ২৬ মিলিয়ন টিইইউ কন্টেইনার হ্যান্ডেল করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৬ দমমিক ৮ শতাংশ বেশি। তবে এই উন্নতির গতি অত্যন্ত ধীর। বাংলাদেশে এখনো তৈরি পোশাক চালানের গড় লিড টাইম বা উৎপাদন থেকে গন্তব্যে পৌঁছানো ৯৫ দিন, যেখানে ভিয়েতনামে ৬০ দিন এবং চীনে ৩২ দমমিক ৫ দিন।
বাড়তি সময় লাগার অর্থনৈতিক মূল্যও অনেক। একটি কন্টেইনার জাহাজ ভারতীয় বন্দরে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কাজ শেষ করতে পারে। কিন্তু একই জাহাজ চট্টগ্রামে এলে অতিরিক্ত ৩০ ঘণ্টা বিলম্বের সম্মুখীন হতে পারে, যার ফলে জাহাজ ভাড়া, ক্রু খরচ, জেটি ফি, লাইটারেজ চার্জসহ অন্যান্য খরচ বেড়ে যায়।
সমাধানের পথে বাধা রাজনৈতিক প্রতিরোধ
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেলে নিউ মুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল এবং পরিকল্পিত বে টার্মিনালের মতো সুবিধাগুলির জন্য আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটরদের যুক্ত করার কথা বিবেচনা করেছে। এ নিয়ে বন্দর কর্মকর্তা, ব্যবসায়িক গোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদাররা বলছে, এই ধরনের অংশীদারত্ব অটোমেশন, আধুনিক ক্রেন এবং ডিজিটাল পোর্ট-কমিউনিটি সিস্টেম নিয়ে আসবে। এতে টার্নঅ্যারাউন্ড সময় এবং বন্দরে কন্টেইনার অপেক্ষার সময় নাটকীয়ভাবে কমে যাবে।
তবে বিদেশি অপারেটর নিয়োগে রাজনৈতিক প্রতিরোধ এখনো শক্তিশালী। বেশ কয়েকটি শ্রমিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দল মনে করে, বিদেশি অপারেটরদের টার্মিনাল পরিচালনার অনুমতি দিলে জাতীয় সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে। তবে বিশ্বব্যাপী উদাহরণ তুলে ধরে ভিন্ন চিত্র। বিল্ড-অপারেট-ট্রান্সফার-এর মতো মডেলগুলোতে জমি এবং মূল অবকাঠামো সরকারের মালিকানাধীনই থাকে। অপারেটররা শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। ভারত এবং সামুদ্রিক অর্থনীতিতে সফল অনেক দেশ এই মডেল ব্যবহার করেছে।
বাংলাদেশের জন্য সতর্কতা
ডিপি ওয়ার্ল্ডের বর্ধিত বিনিয়োগ, ভারতে কমে যাওয়া টার্নঅ্যারাউন্ড সময় এবং বৈশ্বিক বন্দর র্যাঙ্কিংয়ে ভারতের শক্তিশালী অবস্থান প্রমাণ করে যে, এখন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা-সক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে আঞ্চলিক লজিস্টিকস-এর গতি, পূর্বাভাসের দক্ষতা ও প্রযুক্তি।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, বাংলাদেশকে এখন অবশ্যই টার্নঅ্যারাউন্ড সময়, বন্দরে অবস্থানের সময় এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক পারফরম্যান্স র্যাঙ্কিংয়ের মতো ডেটা-নির্ভর সূচককে নীতির কেন্দ্রে রাখতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের দ্রুত অটোমেশন, শুল্ক ও পোর্ট-কমিউনিটি সিস্টেমের সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন এবং স্পষ্ট পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারত্ব নীতির প্রয়োজন। অটোমেশন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাকরি নিরাপত্তা ও দক্ষতা উন্নয়নের জন্য শ্রমিক, ব্যবসায়িক গোষ্ঠী এবং সরকারের মধ্যে চুক্তির প্রয়োজন বলেও মনে করেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের কম খরচে শ্রমের সুবিধা এখন আর যথেষ্ট নয়। কারণ, এখন নির্ভরযোগ্যতা দিয়ে সাপ্লাই-চেইন বিবেচনা করা হয়। ভারত বেসরকারি অপারেটরদের সঙ্গে তার অংশীদারত্ব জোরদার করছে এবং লজিস্টিকসের দ্রুত গতির ওপর জোর দিচ্ছে জন্য চাপ দিচ্ছে। এ সময় বাংলাদেশের জন্য অনিবার্য হয়ে উঠছে সেই প্রশ্ন: চট্টগ্রাম বন্দর যদি এখনো ৩ দশমিক ২৩ দিনের জাহাজ অপেক্ষা এবং ১১ দিনের ছাড়পত্র বিলম্বের সঙ্গে সংগ্রাম করে, তবে কি বাংলাদেশ তার রপ্তানি-নির্ভর প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে পারবে?


