টানা বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ায় রাজধানীর হাটগুলো পরিণত হয়েছে দুর্ভোগে। এতে ক্রেতার উপস্থিতি কমে যাওয়ায়, চাওয়া দামের তুলনায় অনেক কম মূল্যে পশু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। বড় ধরনের লোকসান এড়াতে শেষ মুহূর্তে কম দামেই গরু ছেড়ে দিচ্ছেন অনেকে।
বুধবার ঢাকার গাবতলী, বসিলা, বাড্ডা, মগবাজার, মধুবাগ, ওয়্যারলেস, শাহজাহানপুর, রামপুরা, আফতাবনগর, মেরাদিয়া, শ্যামপুর ও পূর্বাচলের ৩০০ ফুট এলাকার হাট ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। কোথাও হাঁটুসমান কাদা, কোথাও জমে আছে বৃষ্টির পানি। ফলে পশু পরিবহন, পরিচর্যা ও বেচাকেনা সব ক্ষেত্রেই নেমে এসেছে ধীরগতি।
পঞ্চগড় থেকে গরু নিয়ে আসা খামারি মো. হারুন বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে গরুগুলো ঠিকমতো বসতে পারছে না। ক্রেতারাও কাদার মধ্যে হাট ঘুরে দেখতে পারছেন না। এতে বেচাকেনা কমে গেছে। তাই কম দামেই ছেড়ে দিতে হচ্ছে।’
কুষ্টিয়া থেকে আসা ব্যবসায়ী আব্দুস সোবহান বলেন, ‘গরু নিয়ে আসতেই অনেক খরচ হয়েছে। এখন বিক্রি না হলে আবার ফেরত নিতে বাড়তি খরচ লাগবে। তাই কিছুটা কম দাম হলেও বিক্রি করে দিচ্ছি।’
এদিকে, গাবতলী পশুর হাটে কুষ্টিয়া থেকে আনা একটি মাঝারি আকারের গরুর জন্য প্রথমে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা দাম চেয়েছিলেন ব্যবসায়ী সুরুজ আলী। কিন্তু সারাদিন ক্রেতা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ১ লাখ ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করতে রাজি হন তিনি। সুরুজ আলীর দাবি, পরিবহন, খাবার ও শ্রমিক খরচ হিসাব করলে গরুটি বিক্রি করে প্রায় ১৫ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যে দামে বিক্রির আশা ছিল, সেই দাম পাওয়া যাচ্ছে না। বৃষ্টি আর কম ক্রেতার কারণে দরপতন হয়েছে।’
সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থেকে ১০টি গরু নিয়ে পূর্বাচলের ৩০০ ফুট এলাকার হাটে আসা ইসমাইল মিয়া বলেন, ‘বৈরী আবহাওয়ার কারণে অল্প লাভে আটটি গরু বিক্রি করেছি। বাজারে পশু আছে, কিন্তু ক্রেতা কম। এবার অনেক ব্যবসায়ীকেই লোকসান গুনতে হচ্ছে।’
রাজধানীর বসিলা হাটে গরু নিয়ে আসা ব্যবসায়ী আবুল কাশেম বলেন, ‘দুই দিন ধরে বৃষ্টির কারণে ক্রেতা কম। গত সপ্তাহে যে গরুর দাম ২ লাখ টাকা চেয়েছিলাম, এখন ১ লাখ ৮০ হাজার টাকাতেও বিক্রি করে দিতে হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কমপক্ষে ৩০-৩৫ হাজার টাকা লাভের আশা ছিল। এখন খরচ বাদ দিলে ১০ হাজার টাকার মতো লোকসান হবে।’
বাড্ডা হাটের ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘হাটে পশুর সরবরাহ পর্যাপ্ত আছে। কিন্তু ক্রেতারা অপেক্ষা করছেন দাম আরও কমার জন্য। এতে ব্যবসায়ীরা চাপের মধ্যে পড়েছেন।’
হাজারীবাগের ইনস্টিটিউট অব লেদার টেকনোলজি মাঠসংলগ্ন হাটে গরু বিক্রি করতে আসা ব্যবসায়ী মো. জাহাঙ্গীর বলেন, ‘কাদা ও পানি জমে থাকায় ক্রেতারা দীর্ঘ সময় হাটে থাকতে চাইছেন না। ফলে দরদাম কমেই শেষ করতে হচ্ছে।’
সূত্রাপুরের সাদেক হোসেন খোকা মাঠের হাটে ব্যবসায়ী নুর ইসলাম বলেন, ‘ঈদের আগের সময়টায় সাধারণত হাটে ভিড় থাকে। কিন্তু এবার বৃষ্টির কারণে সেই পরিবেশ নেই। গরু রেখে দিলে খাওয়ানো ও দেখাশোনার খরচ বাড়বে, তাই কম দামেও বিক্রি করছি।’
হাট ঘুরে দেখা গেছে, মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তবে ক্রেতাদের তুলনায় পশুর সরবরাহ বেশি থাকায় বিক্রেতারা কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাচ্ছেন না। ব্যবসায়ীদের দাবি, গত কয়েক দিনের তুলনায় গরুর দাম ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। বিশেষ করে বড় ও মাঝারি গরুর ক্ষেত্রে দরপতন বেশি দেখা যাচ্ছে।
ক্রেতারাও বলছেন, বৃষ্টির কারণে দুপুরের পর থেকে পশুর দাম কিছুটা কমেছে। তবে ছোট আকারের গরুর ক্ষেত্রে বিক্রেতারা এখনও তুলনামূলক বেশি দাম চাইছেন।
ব্যবসায়ীদের মতে, ভারতীয় গরু না আসায় স্থানীয় খামারিদের ভালো দাম পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বৈরী আবহাওয়া সেই সম্ভাবনায় বড় ধাক্কা দিয়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন, আবহাওয়া অনুকূলে না ফিরলে ঈদের আগমুহূর্তে অনেককেই লোকসান গুনতে হবে।


