তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির বিপরীতে চট্টগ্রাম শুল্ক ভবনের দাবি করা ২১ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকার বকেয়া থেকে আট হাজার ১০৩ কোটি টাকা মওকুফ চেয়েছে পেট্রোবাংলা। একই সঙ্গে অবশিষ্ট অর্থ আগামী কয়েক বছরে কিস্তিতে পরিশোধের প্রস্তাব দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি।
২০২১ সাল থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি সংক্রান্ত বকেয়া শুল্কের পরিমাণ ক্রমাগত বেড়েছে। ফলে রাজস্বের হিসাবে পেট্রোবাংলা সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত খেলাপি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
চট্টগ্রাম শুল্ক ভবনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছর শেষে পেট্রোবাংলার অপরিশোধিত বকেয়ার পরিমাণ ২১ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকাতেই অপরিবর্তিত ছিল। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও চট্টগ্রাম শুল্ক ভবন বারবার তাগাদা দিলেও ওই অর্থবছরে কোনো বকেয়া পরিশোধ করা হয়নি।
শুল্ক কর্মকর্তাদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে পেট্রোবাংলার কাছ থেকে বকেয়া আদায় করা গেলে সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম শুল্ক ভবনের রাজস্ব আদায়ে যে বড় ঘাটতি রয়েছে, তা কমাতেও সহায়তা করবে।
অবশ্য পেট্রোবাংলার দাবি, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে অর্থ পরিশোধ করছে না, বিষয়টি ঠিক তা নয়; বরং কাঠামোগত ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে এই বকেয়া জমেছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি এরইমধ্যে আট হাজার ১০৩ কোটি টাকা মওকুফের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে আবেদন করেছে। একই সঙ্গে অবশিষ্ট ১৩ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা পর্যায়ক্রমে পরিশোধের প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে।’
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, শুল্ক কর্তৃপক্ষের মোট দাবি করা অর্থ দুটি আলাদা অংশে বিভক্ত। এর প্রথম অংশ আট হাজার ১০৩ কোটি টাকা মওকুফের আবেদন করা হয়েছে। আমদানি ও বিতরণ পর্যায়ে দ্বিস্তর মূল্য সংযোজন কর ব্যবস্থার জটিলতার কারণে এই অর্থের দায় সৃষ্টি হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি জানায়, বাংলাদেশ জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ কমিশন অনুমোদিত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্যহারে অতিরিক্ত মূল্য সংযোজন কর অন্তর্ভুক্ত না থাকায় গ্রাহকদের কাছ থেকে দুইবার কর আদায় করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে এই অংশ মওকুফের অনুরোধ জানিয়েছে।
অবশিষ্ট ১৩ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা পরিশোধযোগ্য শুল্ক বকেয়া। পেট্রোবাংলা জানায়, ভর্তুকি দেওয়া অভ্যন্তরীণ বিক্রয়মূল্যের তুলনায় আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক বেশি দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করায় সংস্থাটি তীব্র আর্থিক চাপে রয়েছে।
পাশাপাশি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এবং বাংলাদেশ রাসায়নিক শিল্প করপোরেশনের কাছে পেট্রোবাংলার বিপুল পরিমাণ বিল বকেয়া থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এসব বকেয়ার কারণে শুল্কের দায় পরিশোধে সংস্থাটির সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছে।
মিজানুর রহমান বলেন, ‘১৩ হাজার ৪২৬ কোটি টাকার বেশির ভাগই গত বছরের ২ জুনের আগে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। ওই তারিখে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির ওপর মূল্য সংযোজন কর প্রত্যাহার করা হয়।’
‘আমরা পর্যায়ক্রমে বকেয়া পরিশোধ করব। বিদ্যুৎ ও সার খাতের কাছে আমাদের যে পাওনা রয়েছে, তা আদায়ের ওপর পরিশোধের গতি অনেকাংশে নির্ভর করবে। আগামী মাস থেকে অর্থ পরিশোধ শুরু করতে পারব বলে আশা করছি’, যোগ করেন তিনি।
এদিকে বকেয়া পরিশোধের জন্য সর্বোচ্চ ১৫ বছর সময় দেওয়ার প্রস্তাব করা হলেও পেট্রোবাংলা আশা করছে, আর্থিক অবস্থার উন্নতি হলে পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে ১৩ হাজার ৪২৬ কোটি টাকার বকেয়া পরিশোধ করা সম্ভব হবে।
তবে বাকি আট হাজার ১০৩ কোটি টাকা মওকুফ হবে কি না, তা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
চট্টগ্রাম শুল্ক ভবনের কর্মকর্তারা জানান, ২০২১ সাল থেকে পেট্রোবাংলার শুল্ক বকেয়া জমছে। বেসরকারি আমদানিকারকদের পণ্য খালাসের আগে প্রযোজ্য সব শুল্ক পরিশোধ করতে হলেও বিশেষ ব্যবস্থায় পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে আগে আমদানি করা পণ্য খালাস এবং পরে শুল্ক পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম শুল্ক ভবনের মুখপাত্র ও সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, ‘পেট্রোবাংলার বকেয়া পরিশোধে বিলম্ব শুল্ক রাজস্ব সংগ্রহে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলেছে। ২০২১ সাল থেকে বকেয়া শুল্ক জমছে। পেট্রোবাংলা বিলম্বে অর্থ পরিশোধের সুবিধা পাওয়ায় অপরিশোধিত দায় ক্রমাগত রাজস্ব সংগ্রহকে প্রভাবিত করছে।’


