ভোটার তালিকা থেকে ব্যাপক হারে নাম বাদ পড়ার অভিযোগ এবং মুসলিম-বিদ্বেষী ও বাংলাদেশ-বিরোধী প্রচারণার উত্তেজনার মধ্যেই বৃহস্পতিবার পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। মোট ২৯৪টি আসনের মধ্যে প্রথম দফায় বৃহস্পতিবার ১৫২টিতে এবং বাকি আসনগুলোতে ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় ভোট গ্রহণ হবে। ফলাফল ঘোষণা হবে ৪ মে।
পুরো রাজ্য এখন কঠোর নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা। শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নির্বাচন কমিশন প্রায় ২ লক্ষ ৫০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করেছে, যা পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বলে জানা গেছে। নির্বাচনের পরিবেশ এতটাই থমথমে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এমনকি কূটনৈতিক যানবাহনও তল্লাশি করেছে, যদিও প্রোটোকল অনুযায়ী এই গাড়িগুলো তল্লাশির আওতামুক্ত থাকে।

মূলত তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি), ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি), ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (আইএনসি) এবং সিপিআই (এম)-এর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট জোটের মধ্যেই এবারের লড়াই। গত নির্বাচনে তৃণমূল ২১৫টি আসন জিতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা নিশ্চিত করেছিল।
অনেকেই ধারণা করছেন, তৃণমূল এবারও জিততে পারে। কারণ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার বিতর্ক এবং ডানপন্থী শক্তির সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের চেষ্টাকে পশ্চিমবঙ্গের ধর্মনিরপেক্ষ ভোটাররা প্রত্যাখ্যান করতে পারেন।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে ভোটার তালিকার ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) নিয়ে। এই প্রক্রিয়ায় খসড়া তালিকা থেকে প্রায় ৯০ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যা মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ।
নির্বাচনী কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, মৃত্যু বা অনুপস্থিতির কারণে ৬০ লাখেরও বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে বাকি ২৭ লক্ষ ভোটারের অবস্থান এখনো অমীমাংসিত। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে পুরো পরিবারের নামই বাদ পড়েছে এবং বিষয়গুলো যাচাইয়ের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছে।
যদিও ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও এই রিভিশন (এসআইআর) কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে, তবে পশ্চিমবঙ্গ এক্ষেত্রে আলাদা। কারণ, এখানে প্রাথমিক সংশোধনের পর বিচারিক পর্যায়ের একটি অতিরিক্ত স্তর যোগ করা হয়েছে, যা স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তুলেছে।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ক্ষতিগ্রস্তদের একটি বড় অংশই মুসলিম, যাদের অনেককে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এর ফলে বৈধ ভোটারদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার এবং নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
মুর্শিদাবাদ থেকে প্রবীণ সাংবাদিক আব্দুল ওদুদ জানিয়েছেন, তার নিজের গ্রামের ১ হাজার ৪২ জন ভোটারের মধ্যে ৪৪৯ জনের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যাদের অধিকাংশই মুসলিম। তিনি এই প্রক্রিয়াকে নির্বাচনী ফলাফল প্রভাবিত করার একটি কৌশল হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তৃণমূল কংগ্রেস শুরু থেকেই এই সংশোধন প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। অন্যদিকে, বিজেপি এই পদক্ষেপকে ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বলে সমর্থন জানাচ্ছে।
বাংলাদেশ-বিরোধী প্রচারণা
ভোটার তালিকার বিতর্কের পাশাপাশি নির্বাচনী প্রচারণায় মুসলিম-বিদ্বেষী এবং বাংলাদেশ-বিরোধী বক্তব্যের ব্যাপক উত্থান দেখা গেছে, বিশেষ করে ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে। বিশ্লেষকদের মতে, হিন্দু ভোট একত্রিত করার লক্ষ্যেই একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে ‘বহিরাগত’ হিসেবে তুলে ধরার এই রাজনৈতিক কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে।
নির্বাচনী সভায় বিজেপি নেতারা একাধিকবার ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ প্রসঙ্গ তুলেছেন এবং ক্ষমতায় এলে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সমালোচকরা বলছেন, এ ধরনের বক্তব্য শুধু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কেই লক্ষ্যবস্তু করে না, বরং বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ককেও ঝুঁকির মুখে ফেলে।

সাংবাদিক আব্দুল ওদুদ উল্লেখ করেন, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে আগে কখনো ক্ষমতায় আসেনি, তাই তারা ধর্মীয় পরিচয়কে পুঁজি করে ভোট বাড়াতে চাইছে। তিনি বলেন, ‘তারা ভয়ভীতি তৈরির মাধ্যমে এবং বাংলাদেশ-বিরোধী বয়ান দিয়ে হিন্দু ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে।’
এ ছাড়া এই সংশোধন প্রক্রিয়ার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা, যাদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাদের ওপর আইনি বা প্রশাসনিক খড়্গ নেমে আসতে পারে, এমনকি তাদের সীমান্ত পার করে দেওয়ার চেষ্টাও হতে পারে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর প্রভাব
পশ্চিমবঙ্গের এই পরিস্থিতি ঢাকাও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন সাবেক কর্মকর্তা বিষয়টিকে ‘গুরুতর উদ্বেগের’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি অতীতে ঘটা এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত সীমান্ত পুশ-ব্যাকের চেষ্টার কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
তিনি উল্লেখ করেন, এ ধরনের পদক্ষেপ ভারতের নিজস্ব আদালতেই আগে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, যেখানে আদালত কর্তৃপক্ষকে তাদের নাগরিকদের দায়িত্ব নিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
তিনি আরও বলেন, ‘ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে সচেতন করা প্রয়োজন এবং এ ধরনের কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে তা মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।’
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, নির্বাচনী ফায়দা হাসিলের জন্য বাংলাদেশ-বিরোধী বক্তব্য অব্যাহত থাকলে তা ঢাকা ও নয়াদিল্লির দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তারা মনে করেন, স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশল আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার পরিবেশ নষ্ট করছে।
পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনের ফলাফল কেবল রাজ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার সামাজিক সংহতি এবং আন্তসীমান্ত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।


