ফেরার গুঞ্জনের মধ্যেই ব্যাংকপাড়ায় এস আলমের শক্তি প্রদর্শন

ফেরার গুঞ্জনের মধ্যেই ব্যাংকপাড়ায় এস আলমের শক্তি প্রদর্শন
রোববার এস আলমের হাতে ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়া এবং শিল্পগোষ্ঠীটির নিয়োগকৃত কর্মকর্তাদের কর্মক্ষেত্রে পুনর্বহালের দাবি তোলেন আন্দোলনকারীরা। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

ব্যাংকিং খাতে এক সময়ের প্রভাবশালী ও বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলমকে ঘিরে উদ্বেগ নতুন মাত্রা পেয়েছে। লুটপাট ও অর্থ পাচারের অভিযোগে তদন্ত, মালিকানা হারানো এবং আইনি নিষেধাজ্ঞার পরও রোববার ইসলামী ব্যাংকের সামনে কয়েক হাজার মানুষের শোডাউন গুঞ্জনকে আরও জোরালো করেছে। পর্দার আড়াল থেকে প্রভাব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা কি এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে?

এদিন আন্দোলনকারীরা এস আলমের হাতে ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়া এবং শিল্পগোষ্ঠীটির নিয়োগকৃত কর্মকর্তাদের কর্মক্ষেত্রে পুনর্বহালের দাবি তোলেন।

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন আরও তীব্র হয়েছে, সংস্কারের পথে থাকা ব্যাংক খাত কি আবারও পুরনো ঝুঁকির মুখে পড়ছে?

ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/টাইমস

রোববার মতিঝিলের দিলকুশায় ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে সকাল থেকেই জড়ো হতে থাকেন চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ। সরেজমিনে দেখা যায়, কয়েক হাজার মানুষ দুপুর পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। তাদের অনেকেই চট্টগ্রাম ও পটিয়া অঞ্চল থেকে ঢাকায় এসে এই কর্মসূচিতে অংশ নেন।

আন্দোলনকারীদের দাবি, ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক–এই পাঁচটি ব্যাংকের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে আগের মালিকানায় ফিরিয়ে দিতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যেসব কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত হয়েছেন, তাদের পুনর্বহালের দাবি জানান তারা।

তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে তারা এসব ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই চাকরি হারাতে হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে তারা ’অন্যায্য ও অবৈধ’ বলে অভিহিত করেন।

আরও পড়ুন

তবে ব্যাংকের ভেতর থেকে এই দাবির বিরোধিতাও এসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা টাইমসকে বলেন, আন্দোলনকারীদের একটি বড় অংশের নিয়োগপ্রক্রিয়া ছিল অস্বচ্ছ। কোনো নিয়োগবিজ্ঞপ্তি ছাড়াই অনেককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরে নিয়োগ যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষা নেওয়া হলেও অধিকাংশই তাতে অংশ নেননি। যারা অংশ নিয়েছেন, তারা চাকরিতে বহাল আছেন বলে তিনি দাবি করেন।

ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/টাইমস

দুপুরের পরপরই একই স্থানে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের কর্মসূচি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘গ্রাহক ফোরাম’ ব্যানারে আরেকটি পক্ষ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। তারা এস আলমকে ‘ব্যাংক লুটেরা’ আখ্যা দিয়ে তাকে গ্রেপ্তার, সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার দাবি জানান।

এই পক্ষের বক্তব্য, অতীতে যেসব ব্যাংক জোর করে দখল করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করেন, চাকরিচ্যুত এই গ্রুপকে যেন কোনোভাবেই আবার ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরতে দেওয়া না হয়।

এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের পেছনে যে বড় বাস্তবতা রয়েছে, তা হলো এস আলম গ্রুপকে ঘিরে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের ব্যাপ্তি। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ প্রায় ১ দশমিক ১৩ লাখ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করছে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল্যায়নে উঠে এসেছে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে মোট সোয়া ২ লাখ কোটি টাকা ঋণের নামে সরিয়ে নিয়েছে আওয়ামী ঘনিষ্ঠ শিল্পগোষ্ঠীটি।

ঋণ খেলাপির চিত্রেও এই গোষ্ঠীর প্রভাব স্পষ্ট। জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১টিই এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ, ব্যাংকিং খাতের বড় অংশজুড়েই এই গোষ্ঠীর আর্থিক দায় ও ঝুঁকি ছড়িয়ে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/টাইমস

এই প্রেক্ষাপটে ব্যাংক রেজল্যুশন আইনে নতুন ১৮(ক) ধারা যুক্ত হওয়ায় বিতর্ক আরও বেড়েছে। এই ধারার মাধ্যমে এস আলমসহ আগের বিতর্কিত মালিকদের জন্য ফিরে আসার একটি আইনি সুযোগ তৈরি হয়েছে কি না– তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

এ বিষয়ে শনিবার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘আইনে সবার জন্য সমান সুযোগ রাখা হয়েছে। আইন যদি সংবিধানের বা অন্য কোনো আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয় তাহলে সুপ্রিম কোর্ট আইনের ব্যাখ্যা দিতে পারবেন।’

তার এই বক্তব্যকে অনেকে এমন ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন, আইনি কাঠামোর মধ্যেই মালিকানা ফেরার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করা হচ্ছে না।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad