বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন করে ভূ-রাজনৈতিক তৎপরতা দেখা দিয়েছে। ঢাকা-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত সক্রিয় হচ্ছে। একই সঙ্গে নীরবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করছে দেশ দুটি।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরই এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও বঙ্গোপসাগরজুড়ে প্রভাবের ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। কূটনীতিকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তর এখন ওয়াশিংটন ও দিল্লির উভয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে উঠে এসেছে।
একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ভারত আড়ালে প্রচেষ্টা আরও জোরদার করেছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, জঙ্গিবাদ পুনরুত্থানের ঝুঁকি এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কারণে দলটির অংশগ্রহণকে দিল্লি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে।
দিল্লিতে কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভের সাইডলাইনে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান ও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের বৈঠকে বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এর পরপরই কাতারে দুই পক্ষের আরেক দফা বৈঠক হয়।
আলোচনাটি পরিচালনা করেন কাতারের আমিরি দিওয়ানের প্রধান আবদুল্লাহ বিন মোহাম্মদ বিন মুবারক আল খুলাইফি, যিনি যুক্তরাষ্ট্র-কাতার নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারে ভূমিকার জন্য সিআইএ’র জর্জ টেনেট মেডেলে ভূষিত হন।
সূত্র বলছে, দোহা বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। এ সময় বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ওয়াশিংটনের বাড়তি আগ্রহের ইঙ্গিত দেয়। ঢাকা-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, খলিলুর রহমান ২৫ থেকে ২৮ নভেম্বর কাতারে অবস্থান করছেন। যদিও সরকারি আদেশে সফরের উদ্দেশ্য উল্লেখ নেই।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগে বেশ কিছু জায়গায় সাযুজ্য আছে বলে জানিয়েছেন আলোচনায় ঘনিষ্ঠ কূটনীতিকরা। ভারতের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতি ও ‘জঙ্গিবাদ পুনরায় বিস্তারের ঝুঁকি’। একই সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব দিল্লির অস্বস্তি বাড়িয়েছে। কারণ, বেইজিং দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করছে। ওয়াশিংটনের উদ্বেগও একই। তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে ভারতকে কেন্দ্রে রেখে বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে, অভ্যন্তরীণ আলোচনার সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত আনার প্রশ্নটিও কিছু পর্যায়ে আলোচনায় উঠেছে। তবে তারা বলছেন, নির্বাচন প্রশ্নে সুস্পষ্টতা না আসা পর্যন্ত এ বিষয়ে ভারত কোনো আগ্রহ দেখাতে রাজি নয়।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ঢাকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারতের প্রত্যাশা এখন বেশ পরিষ্কার। দিল্লি মনে করে, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের প্রভাব কিছুটা কমে গেছে এবং সেটি পুনরুদ্ধারে ওয়াশিংটনের সমর্থন প্রয়োজন।
অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্র চায় মিয়ানমারের রাখাইন অঙ্গরাজ্যে ভারতের ভূমিকা আরও জোরদার হোক, যেখানে আরাকান আর্মি ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠী নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতা প্রক্রিয়ায় ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করে ওয়াশিংটন।
এসবের মধ্যেই ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে সাম্প্রতিক ঢাকা সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি ‘বিশেষ বার্তা’ নিয়েই এসেছিলেন বলে একাধিক সূত্র জানায়। যদিও কোনো পক্ষই বার্তার বিষয়বস্তু প্রকাশ করেনি। সফরটিকে অনেকেই বাংলাদেশের নির্বাচনকে ঘিরে এক ধরনের নীরব ‘ট্র্যাক-টু কূটনীতি’ হিসেবে দেখছেন।
আওয়ামী লীগ এখনো নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দেয়নি। ফলে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাইরে আঞ্চলিক কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণে বেড়েছে। ওয়াশিংটনের কাছে সুষ্ঠু নির্বাচন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা যেমন আঞ্চলিক স্বার্থরক্ষার অংশ, তেমনি ভারতের কাছে অগ্রাধিকার সীমান্ত স্থিতি বজায় রাখা ও চীনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রাখা।
কূটনৈতিক তৎপরতা যত বাড়ছে, আলোচনায় এখন দুটি প্রশ্নই সবচেয়ে প্রাধান্য পাচ্ছে। একটি হলো–আওয়ামী লীগ কি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেবে? অন্যটি সমঝোতার পরিবেশ তৈরি হলে ফেব্রুয়ারির ভোট কি পেছাতে পারে?


