গত শনিবার নেপালের পোখরা রঙ্গশালায় যখন সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা হাতছাড়া করে মাঠ ছাড়ছিল বাংলাদেশ, ড্রেসিংরুমজুড়ে তখন কেবলই নিস্তব্ধতা আর বিষাদ। তবে সেই অন্ধকার মেঘের মাঝেও রুপালি রেখা হয়ে জ্বলে উঠেছেন পঞ্চগড়ের এক কিশোরী আলপি আক্তার। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার (৭ গোল) পুরস্কার আর টুর্নামেন্ট-সেরার ট্রফি হাতে নিয়ে যখন তিনি পোখরা থেকে ফিরলেন, তখন তাঁর চোখেমুখে কেবলই আগামীর জেদ। সেই জেদের প্রতিফলন আজ মঙ্গলবারও দেখা গেল ঘরোয়া নারী লিগে। কমলাপুরের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে সদ্যপুস্কুরিনী যুব স্পোর্টিং ক্লাবের বিপক্ষে রাজশাহী স্টারস ফুটবল ক্লাবের ৮-০ গোলের দাপুটে জয়ে হ্যাটট্রিক করেছেন এই ‘গোল মেশিন’। এই নিয়ে লিগে ৯ ম্যাচে আলপির গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮-এ।
মাঠের এই দাপুটে আলপির পেছনের গল্পটা মোটেও মসৃণ ছিল না। পঞ্চগড় জেলার বোদা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আলপি। বাবা আতাউর রহমান বোদা বাজারে চায়ের দোকানে বিস্কুট বিক্রি করে কোনোমতে সংসার টানেন। সেই টানাটানির সংসারে মেয়ের ফুটবলার হওয়া ছিল অনেকটা বিলাসিতার মতো। শুরুতে সমাজ থেকে উড়ে আসত বাঁকা কথা; মেয়ে হয়ে কেন ফুটবল খেলবে বা কেন ছোট করে চুল কাটবে এমন তির্যক মন্তব্যে মা-বাবাও শুরুতে শঙ্কিত ছিলেন। তবে এই দুর্গম পথে আলপির সবচেয়ে বড় ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর ভাই। আলপি নিজেই বলছিলেন, ‘আমার ভাই আমাকে অনেক সাপোর্ট করে। তারা এখন আমার এই অর্জন নিয়ে অনেক খুশি। যখন প্রথম প্রথম খেলতাম, এলাকার লোক অনেক খারাপ কথা বলত। এরপর যখন দেখল আমি ভালো জায়গায় যেতে চাই, তখন তারা বুঝতে পেরেছে। এখন আমাকে সবাই সাপোর্ট করে।’
ফুটবলার হিসেবে আলপির শুরুটা ছিল বেশ বৈচিত্র্যময়। একাডেমিতে ও বঙ্গমাতা টুর্নামেন্টে প্রথম দুই বছর গোলকিপার হিসেবে খেললেও পরে উঠে আসেন আক্রমণভাগে। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। রংপুর বিভাগের সেরা স্ট্রাইকার হয়ে অনূর্ধ্ব-১৬ জাতীয় ক্যাম্পে ডাক পাওয়া, আর সেখান থেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পদার্পণ। পিটার বাটলারের হাত ধরে আজ তিনি দলের অপরিহার্য অংশ। নিজের গোল করার দক্ষতা নিয়ে আলপি জানান, ‘আগে যখন খেলতাম, তখন ফিনিশিংয়ে কনফিডেন্স পেতাম না। এরপর বেশি বেশি বল নিয়ে প্র্যাকটিস করার পরে আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। এখন শট নিলে মনে হয় যে গোল হবে।’
মাঠের পারফরম্যান্স নিয়ে আলোচনা হলেও আলপির ব্যক্তিগত জীবনের লড়াইটা আর্থিক স্বচ্ছলতার। অভাবের সংসার কি ফুটবল খেলে বদলানো সম্ভব? এমন প্রশ্নের জবাবে আলপির কণ্ঠে ঝরল দৃঢ় প্রত্যয়, ‘ফুটবল দিয়ে সবই করা সম্ভব, পরিবার থেকে শুরু করে নিজের সব পরিবর্তন করা সম্ভব।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘ফুটবল খেলে আমি অনেক ভালো জায়গায় যেতে চাই, দেশের জন্য কিছু করতে চাই।’
ব্যক্তিগত জীবনে লিওনেল মেসির ভক্ত আলপি বর্তমানে জাতীয় দলের হামজা চৌধুরীকে নিজের আইডল মানেন। ফুটবলার না হলে হয়তো পড়াশোনাতেই মন দিতেন, তবে বর্তমানে খেলার পাশাপাশি চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষা জীবনও; সামনেই তাঁর এসএসসি পরীক্ষা। মাঠের কঠিন লড়াই হোক কিংবা জীবনের প্রতিকূলতা সবই যেন ড্রিবল করে কাটিয়ে গোলমুখে ছুটছেন আলপি। সাফের সেই স্বপ্নভঙ্গের বেদনা ভুলে আলপি এখন ঘরোয়া লিগের শিরোপা জেতাতে চান রাজশাহীকে। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা আমাদের পক্ষ থেকে পুরোপুরি চেষ্টা করব যাতে লিগ ট্রফিটা রাজশাহীর কাছেই যায়।’


