বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফিরোজা আশরাবীর থানা কম্পাউন্ডে বিষপানের ঘটনায় নানা তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করছে পুলিশ। তাকে বিষ পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) দুই কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ভাটারা থানায় পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় গত ১০ জুলাই বিষপান করেন ফিরোজা আশরাবী। পরে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ ঘটনায় ৩ পুলিশকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিবুল হাসান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ফিরোজা আশরাবী সব কিছুই করেছেন তার পরিকল্পনা অনুযায়ী। তিনি আটকের পর ব্লাস্টের কাছে আইনি সহায়তার সুযোগ নিয়ে বাসা থেকে বিষ এনে পান করেছেন। পারিবারিক কলহ ও দাম্পত্য সম্পর্কে জটিলতা থেকেই তিনি এ কাজ করেছেন বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।’
ফিরোজার আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ এনে ব্লাস্টের দুই কর্মী শোভা ও কণার বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। শুক্রবার তাদের গ্রেপ্তারের পর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, ফিরোজা আশরাবী পূর্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আত্মহননের পথ বেছে নেন। মূলত পারিবারিক কলহ ও দাম্পত্য সম্পর্কের জটিলতা থেকেই তিনি এ কাজ করেছেন।
পুলিশ জানায়, ফিরোজা আশরাবী ঢাকা ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির সিনিয়র লেকচারার। তিনি গত মার্চ মাসে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ইলিয়াছ কামাল রিসাদকে বিয়ে করেন। রিসাদের আগের স্ত্রী কানাডা প্রবাসী। ফিরোজারও আগে একটি বিয়ে হয়েছিল। তাদের দুজনের পরিবারই এই সম্পর্ক মেনে নেয়নি। অপরদিকে রিসাদের ‘একাধিক সম্পর্ক’ থাকার বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কলহ চলে আসছিল।
ফিরোজার বিরুদ্ধে পল্লবী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন রিসাদের বোন ফারিস্তা কামাল অধরা।
এজাহার বলা হয়েছে, গত ৯ জুলাই রাত ১১টার দিকে রিসার্চ সংক্রান্ত জরুরি কাগজ দেখানোর অজুহাতে ফিরোজা পল্লবীতে স্বামী ইলিয়াস কামাল রিসাদের বাসায় যান। পরে কৌশলে চায়ের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে রিসাদকে অজ্ঞান করেন। এরপর অচেতন রিসাদের গোপনাঙ্গে আঘাত করেন ফিরোজা। রাত সাড়ে ৩টার দিকে রিসাদ জ্ঞান ফিরে দেখেন তার পুরুষাঙ্গ কাটা। ওই অবস্থায় রিসাদকে হাসপাতালে নিয়ে যান ফিরোজা।
এ মামলার আসামি হিসেবে হাসপাতাল থেকে ফিরোজাকে আটকের পর পুলিশ ভাটারা থানায় রাখে। আর সেখানেই ঘটে বিষপানের ঘটনা।
জানা যায়, ফিরোজা আশরাবীকে আটক করে থানায় আনার সময় তিনি আইনি সহায়তা চেয়ে ব্লাস্টের প্রধান প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট মাহা পাড়ার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ইনহেলার আনার অনুরোধ জানান। এরপর ব্লাস্টের একজন ফিল্ড অফিসার শোভা ও তার সঙ্গী কণা যান ফিরোজার বাসায়। সেখান থেকে একটি ব্যাগ এনে সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে থানায় অবস্থান করা ফিরোজাকে দেন। তখন তিনি ওষুধ খাওয়ার কথা বলে ব্যাগে থাকা বিষ পান করেন।
তাৎক্ষণিকভাবে বিষের গন্ধ পেয়ে থানার দুজন নারী কনস্টেবল নাসিমা ও শারমিন ঝাঁপিয়ে পড়েন। তারা বিষের বোতলটি ছুড়ে ফেললেও ফিরোজা তার আগেই কিছুটা বিষ পান করে ফেলেন। দ্রুত তাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে পাকস্থলী পরিষ্কার করানো হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন সন্ধ্যায় ফিরোজা মারা যান।
এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ভাটারা থানার তৎকালীন ডিউটি অফিসার এসআই জামাল হোসেন ও আশরাবীকে পাহারা দেওয়া দুই নারী কনস্টেবল শারমিন ও নাসিমাকে সাময়িক বরখাস্ত করে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে ক্লোজ করা হয়েছে।
ভাটারা থানায় করা আত্মহত্যা প্ররোচনা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘ব্লাস্টের দুই কর্মীর জামিন শুনানি ছিল সোমবার, তবে ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইফুজ্জামান তা না মঞ্জুর করেন। তদন্তে বেশ কিছু বিষয় উঠে এসেছে, সে সব যাচাই করে দেখা হচ্ছে।’
ব্লাস্টের দুই কর্মীকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘এ বিষয়ে যেহেতু মামলা হয়েছে, তাই এটি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেখা হচ্ছে।’


