ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামে ২০ বিলিয়ন ডলারের একটি বাণিজ্যিক কোম্পানি গঠন করে বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপ পরিচালনার পরিকল্পনা করেছেন। এর মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে কোম্পানির সংখ্যালঘু অংশীদারিত্ব বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফিফা এই পরিকল্পনাকে ‘ফুটবলের গণতান্ত্রিকীকরণ’ ও সদস্য দেশগুলোর জন্য লাভজনক বললেও, ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্তা সংস্থা উয়েফা একে ফুটবলের আত্মা ও সুশাসনের ওপর চরম আঘাত বলে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।
উয়েফা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এটি ফিফার বিক্রির কোনো সম্পত্তি নয় এবং কেউ ফুটবলের মালিক নয়। টাইমস অব লন্ডনের প্রতিবেদনে প্রথম প্রকাশ পায়, এফএফই নামে এই বাণিজ্যিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্ট পরিচালনা করবে।
ফিফা জানায়, ২০ বিলিয়ন ডলারের প্রাথমিক মূল্যায়ন ধরে চলতি বছরের শেষের দিকে এফএফই ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করবে। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ও যত্নসহকারে নির্বাচিত বিনিয়োগকারীরা সংখ্যালঘু ও অ-নিয়ন্ত্রণকারী অংশীদারিত্ব কিনবেন। এই প্রক্রিয়ায় জে পি মরগানের সঙ্গে কাজ করছে ফিফা। সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে জোশ কুশনারের প্রতিষ্ঠিত ‘থ্রাইভ ইটার্নাল’। জোশ কুশনারের ভাই জারেড কুশনার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা।
মাত্রই শেষ হওয়া পুরুষ বিশ্বকাপ ট্রাম্প ও ইনফান্তিনোর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করেছে। উয়েফাসহ বিভিন্ন মহলে এই সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। উয়েফা জানিয়েছে, ফুটবলের আত্মা সুশাসন কোনো বেচাকেনার সম্পদ নয়। বিশেষ করে কারা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো স্বচ্ছতা নেই।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ফিফার বিশ্বজুড়ে ২১১টি জাতীয় সদস্য ফেডারেশন রয়েছে। কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এসব সদস্যের অনুমোদন প্রয়োজন। ফিফা জানিয়েছে, এর বিনিময়ে সদস্য ফেডারেশনগুলো এককালীন ২০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত মূলধন পেতে পারে। ফিফা এক বিবৃতিতে ইনফান্তিনোর বক্তব্য তুলে ধরে জানায়, এটি বিশ্বজুড়ে ফুটবলকে আরও গণতান্ত্রিক করার উদ্যোগ এবং এ বিষয়ে পরামর্শ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
উয়েফা জানিয়েছে, তারা এই প্রতিবেদনের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং প্রতিটি জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনেরও একই মনোভাব পোষণ করা উচিত। উয়েফার ৫৪টি সদস্য ফিফারও সদস্য। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, ফুটবলের নিয়ন্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর এই পদক্ষেপ কোনোভাবেই অতিক্রম করা উচিত নয়।
ফিফার ২০ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব
গত ১৮ জুলাই ম্যানহাটনে বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে ফিফার সদস্যদের সামনে এই পরিকল্পনা তুলে ধরেন ইনফান্তিনো। তিনি ফিফার বাণিজ্যিক সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানোর প্রতিশ্রুতি দেন।
ফিফার ফাস্ট-ফরোয়ার্ড কর্মসূচির আওতায় ২০৩৮ সাল পর্যন্ত ২১১টি সদস্য ফেডারেশনের প্রত্যেকে কত টাকা পাবে, সে বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে ফিফার ঘোষণায়।
২০২৭ থেকে ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ চক্রে পূর্বে প্রতি সদস্যের জন্য ৮ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী এই অঙ্ক হবে যথাক্রমে ২০ মিলিয়ন, ২২ মিলিয়ন ও ২৪ মিলিয়ন ডলার।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে সদ্য সমাপ্ত ২০২৬ বিশ্বকাপে টিকিট আতিথেয়তার চড়া দামের কারণে রেকর্ড ১২ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে ফিফা। তবে ২০৩০ সালে স্পেন, পর্তুগাল মরক্কোর যৌথ আয়োজনে এই আয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ফিফা জানিয়েছে, সদস্য ফেডারেশনগুলো নতুন এই আর্থিক সুযোগ গ্রহণ করবে কি না, তা নিজেরাই নির্ধারণ করতে পারবে।
ফিফার ভাষ্য অনুযায়ী, এফএফই-এর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফুটবল পরিচালনা, প্রতিযোগিতার সূচি, নিয়মনীতি ক্রীড়া সংক্রান্ত সব একচ্ছত্র ক্ষমতা ফিফার হাতেই থাকবে।
বিশ্বকাপ চলাকালীন নরওয়ের ফুটবল ফেডারেশন ইউরোপের শীর্ষ সংস্থা কাউন্সিল অব ইউরোপসহ বিভিন্ন দলের কোচেরাও ফিফার সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
অতীতে বিনিয়োগকারীদের নিয়ে যত বিতর্ক
ইনফান্তিনোর ১১ বছরের বিতর্কিত মেয়াদে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বহু বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করার এটি দ্বিতীয় প্রচেষ্টা।
২০১৮ সালে জাপানের সফটব্যাংকের সঙ্গে ২৫ বিলিয়ন ডলারের ১২ বছরের একটি গোপন প্রস্তাব দিয়েছিলেন ইনফান্তিনো। এর উদ্দেশ্য ছিল সম্প্রসারিত পুরুষ ক্লাব বিশ্বকাপসহ নতুন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা চালু করা, যার পেছনে সৌদি আরবের অর্থায়ন ছিল বলে ধারণা করা হয়।
উয়েফার তীব্র প্রতিবাদের মুখে সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের মতো নিজেদের মূল্যবান সম্পদ নিয়ে শঙ্কিত ছিল।
এরপরও সৌদি ফুটবল দেশটির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন ইনফান্তিনো। ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন করবে সৌদি আরব এবং গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত পুরুষ ক্লাব বিশ্বকাপের বড় অংশের অর্থায়ন করেছিল তারা।
ইনফান্তিনোর ভবিষ্যৎ
সদ্য সমাপ্ত বিশ্বকাপের আর্থিক সাফল্য ইনফান্তিনোকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত চতুর্থ শেষ মেয়াদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পথ প্রশস্ত করেছে।
রুয়ান্ডায় ২০২৩ সালের পুনর্নির্বাচনে ইনফান্তিনো ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, অনুরূপ আর্থিক ফলাফল এনে দেওয়া যেকোনো প্রধান নির্বাহী আজীবন পদে থাকতে পারেন।
ফিফা সভাপতির মেয়াদ শেষ হলে তিনি ফুটবলে অন্য কোনো বৈশ্বিক দায়িত্ব পালন করতে পারেন বলে দীর্ঘ দিন ধরে গুঞ্জন রয়েছে। তার বয়স যখন ৬১ বছর, তখন এই মেয়াদ শেষ হবে।
টাইমস অব লন্ডনের প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন এফএফই পরিচালনার জন্য প্রধান নির্বাহী বা কমিশনারের মতো কোনো পদ ইনফান্তিনোর জন্য তৈরি করা হতে পারে।
ফিফা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিষয়টি কখনো আলোচিত হয়নি। তবে অনুমোদিত হলে এই প্রতিষ্ঠানে ফিফা সভাপতি প্রশাসন প্রধান ভূমিকা পালন করবে এবং তা করা বাধ্যতামূলক।
ফিফা, ইনফান্তিনোর নেতৃত্বাধীন কাউন্সিল ২১১ জন সদস্যের জন্য এই বিষয়ে আলোচনা সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সূচি জানানো হয়নি।
আগামী ২৩ নভেম্বর অনলাইনে ফিফা কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে ২০৩১ ২০৩৫ সালের নারী বিশ্বকাপের স্বাগতিক দেশের নাম চূড়ান্ত করা হবে।


