বর্তমান রাজনৈতিক সময়কে অনেকে নৈতিক পুনর্জন্মের সময় বলে চিহ্নিত করছেন। দীর্ঘদিন দমন, ভয় ও একমুখী ক্ষমতার পর অন্তর্বর্তী ইউনুস সরকারের আবির্ভাব অনেকের কাছে স্বস্তির প্রতীক। কিন্তু ইতিহাস বলে, নৈতিকতার ভাষা যত আকর্ষণীয় হয়, ততই তা সতর্কভাবে পড়তে হয়। কারণ ক্ষমতা বহু সময় নৈতিকতার আড়ালেই নিজের নতুন বিন্যাস সম্পন্ন করে। তাই কে সরকার সেটি প্রশ্ন নয়; প্রশ্ন হলো ক্ষমতার ভাষা কি বদলেছে, নাকি কেবল তার মুখোশ পাল্টেছে।
গ্রামসির ভাষায় রাষ্ট্র কেবল বলপ্রয়োগে টিকে থাকে না, টিকে থাকে সম্মতির মাধ্যমে। বর্তমান শাসনপর্বে সংস্কার, দক্ষতা, গ্রহণযোগ্যতা, আন্তর্জাতিক আস্থা-এসবের মত আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ ও অরাজনৈতিক শব্দগুলো ঘুরেফিরে আসে। কিন্তু বাস্তবে এই শব্দগুলোর কাজ হলো রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে স্থগিত করা। সংস্কারকে এখানে জনগণের রাজনৈতিক দাবি হিসেবে নয়, বরং প্রশাসনিক ও কারিগরি ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। রাজনীতি সরে যাচ্ছে জনপরিসর থেকে, আর সিদ্ধান্ত গ্রহণ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে সীমিত এলিট পরিসরে। এই প্রক্রিয়ায় বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ সম্মতির কাঠামো তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। তারা বলছেন—এই সরকার নিখুঁত নয়, কিন্তু প্রয়োজনীয়। এই মুহূর্তে প্রশ্ন নয়, শৃঙ্খলা দরকার। গণতন্ত্র সময় চায়। ইতিহাসে এই যুক্তিগুলো বহুবার ব্যবহার হয়েছে ক্ষমতাকে স্বস্তিতে রাখার জন্য।
এই ব্যাখ্যাজীবীরা আজ আবার সক্রিয়। তারা বলছেন, দেশ একটি ‘ট্রানজিশন’-এর মধ্যে আছে, গণতন্ত্রকে একটু অপেক্ষা করতে হবে। স্থিতিশীলতা আগে, রাজনীতি পরে। এই যুক্তির ভেতর দিয়েই জন্ম নেয় সম্মতির রাজনীতি—যেখানে জনগণের সক্রিয় সম্মতি নয়, বরং জনগণের ক্লান্ত নীরবতাকে সম্মতি হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। গ্রামসি যাকে বলেছিলেন হেজিমনি শাসন শুধু লাঠি দিয়ে নয়, সম্মতি তৈরি করেই টিকে থাকে। বাংলাদেশে এখন সেই সম্মতির কারখানা আবার চালু হয়েছে, শুধু মালিকানা বদলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে গণভোটের রাজনীতি নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। বলা হচ্ছে, বড় সিদ্ধান্ত জনগণের কাছে নেওয়া হবে। শুনতে খুব গণতান্ত্রিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো “হ্যাঁ” হলে কার লাভ, “না” হলে কার ক্ষতি? গণভোট কোনো নিরপেক্ষ যন্ত্র নয়। এটা ক্ষমতার ভারসাম্যের ভেতরেই কাজ করে। যখন মিডিয়া, প্রশাসন, ন্যারেটিভ সব একদিকে থাকে, তখন গণভোট জনগণের মতামত নয়, ক্ষমতার আত্মপ্রত্যয়ন হয়ে ওঠে। “হ্যাঁ” হলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় ক্ষমতাকাঠামো। কারণ একটি “হ্যাঁ” মানে জনগণ দ্রুত নৈতিক বৈধতায় সম্মতি দিয়েছে, বিতর্ক শেষ। দীর্ঘ রাজনৈতিক আলোচনা, বিরোধী কণ্ঠ, সংগঠিত চাপ সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত করার সুযোগ তৈরি হয়। আর “না” হলে লাভবান হয় তারা, যারা মনে করেন রাজনৈতিক সংস্কার কোনো তাৎক্ষণিক অনুমোদনের বিষয় নয়, বরং অংশগ্রহণ, বিতর্ক ও সময়ের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা একটি প্রক্রিয়া।
সমস্যা হলো, শক্তিশালী রাজনৈতিক দল, মুক্ত গণমাধ্যম ও সমান প্রচারপরিসর ছাড়া গণভোট সহজেই ক্ষমতার হাতিয়ারে পরিণত হয়। ফুকো দেখিয়েছিলেন, আধুনিক ক্ষমতা কাজ করে গভর্নমেন্টালিটি—শাসনপ্রযুক্তি, বিশেষজ্ঞ মত, কমিটি ও নীতিপত্রের মাধ্যমে। এখানে জ্ঞান ও তথ্য নিয়ন্ত্রণই ফল নির্ধারণ করে। কী প্রশ্ন করা হবে, কী বিকল্প থাকবে, কোন ভাষায় প্রচার হবে-সবকিছু যদি ক্ষমতার হাতে থাকে, তাহলে গণভোট আর জনগণের কণ্ঠ থাকে না; তা হয়ে ওঠে শাসনের অনুমোদনপত্র।
বর্তমান অন্তর্বর্তী শাসনে টেকনোক্র্যাটিক শাসনের ছাপ স্পষ্ট। নির্বাচন, প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সবকিছুই প্রস্তুতির নামে বিশেষজ্ঞদের হাতে ন্যস্ত। জনগণ এখানে নাগরিক নয়, বরং ব্যবস্থাপনার বস্তু। এই শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে দেখা হয় ঝুঁকি হিসেবে, আর প্রশ্নকে দেখা হয় বিশৃঙ্খলার সম্ভাবনা হিসেবে।
এই সংকুচিত রাজনৈতিক পরিসরের ভেতরেই মবতন্ত্রের উত্থান ঘটে। যখন সংগঠিত রাজনীতি দুর্বল হয়, আর নৈতিকতার মুখোশ পরা ক্ষমতা জনগণকে অংশগ্রহণের সুযোগ না দিয়ে কেবল সমর্থন চায়, তখন রাজনীতি রাস্তা নেয় ভিড়ের হাতে। মবতন্ত্র একদিকে বিরোধী কণ্ঠকে ভয় দেখায়, অন্যদিকে রাষ্ট্র চাইলে তাকে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততা বলে বৈধতা দেয়। এখানে রাষ্ট্র হয়ে ওঠে লাকাঁর “বিগ আদার”- যার দিকে তাকিয়ে মব নিজের কাজের নৈতিকতা খোঁজে।
বুদ্ধিজীবীদের নীরবতা এই মবতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করে। যুক্তির ভাষা অনুপস্থিত থাকলে আবেগই রাজনীতির ভাষা হয়ে ওঠে। যারা প্রশ্ন তুলতে পারতেন, তারা যখন স্থিতিশীলতার দোহাই দেন, তখন মবই কার্যত রাজনীতির প্রতিনিধি হয়ে দাঁড়ায়।
মিশেল ফুকো আমাদের শিখিয়েছেন জ্ঞান কখনো নিরপেক্ষ নয়। জ্ঞান উৎপাদিত হয় ক্ষমতার ভেতরে, ক্ষমতার প্রয়োজন মেনে। বাংলাদেশে যখন আইন, নিরাপত্তা, উন্নয়ন বা ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা হয়, তখন এক ধরনের “বিশেষজ্ঞ জ্ঞান”হাজির করা হয় যেখানে দমনকে বলা হয় শৃঙ্খলা, নজরদারিকে বলা হয় সুরক্ষা।
ডিজিটাল আইন, সভা–সমাবেশ নিয়ন্ত্রণ, সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্টদের বিরুদ্ধে মামলার পক্ষে যখন তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা হাজির হয়, তখন ফুকোর কথাই সত্য প্রমাণিত হয়: জ্ঞান এখানে ক্ষমতার ভাষ্যকে বৈধতা দেয়। প্রশ্ন চাপা পড়ে, ব্যাখ্যা ফুলে ওঠে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতায়ও অসঙ্গতি স্পষ্ট। দ্রব্যমূল্যের চাপ, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, শ্রমিকের ন্যায্য দাবি এসব প্রশ্নে সরকারের ভাষা সতর্ক ও প্রতিরক্ষামূলক। বাজারনির্ভর নীতি, আন্তর্জাতিক ঋণ ও শর্ত, আর্থিক শৃঙ্খলার নামে সামাজিক ব্যয়ের সংকোচন এসবকে সংস্কার বলা হলেও বাস্তবে তা এক ধরনের শ্রেণিগত পুনর্বিন্যাস। চাপ নামছে নিচের দিকে, স্বস্তি যাচ্ছে ওপরের দিকে।
লাকাঁ মনে করিয়ে দেন মানুষ কেবল যুক্তিতে নয়, আনন্দেও চালিত হয়। নৈতিক উচ্চতার কাছাকাছি থাকার বিশেষ আনন্দ আছে। বর্তমান শাসন সেই নৈতিকতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। অনেক বুদ্ধিজীবী এই অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজেদের সঠিক পক্ষের মানুষ ভাবতে স্বস্তি পাচ্ছেন। ফলে সমালোচনা হচ্ছে শর্তযুক্ত-এখন নয়, পরে। কিন্তু ইতিহাসের চোখে এই বিলম্বই অনেক সময় দায়ে পরিণত হয়।
সংস্কার প্রয়োজন এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সংস্কার যদি প্রশ্নহীন হয়, গণভোট জটিল রাজনীতিকে সরল অনুমোদনে নামিয়ে আনে, মবতন্ত্রকে নীরবে সহ্য করা হয় তবে সেই সংস্কার শেষ পর্যন্ত নতুন সংকট তৈরি করবে। গণতন্ত্র কোনো হ্যাঁ বা না প্রশ্ন নয়। এটি একটি চলমান বিতর্ক, দ্বন্দ্ব ও অংশগ্রহণের প্রক্রিয়া। রাষ্ট্র যদি সত্যিই ভিন্ন হতে চায়, তবে তাকে প্রশ্ন সহ্য করতে হবে গণভোটের আগেও, পরেও। আর বুদ্ধিজীবীদের কাজ হবে মবের আবেগ নয়, প্রশ্নের ভাষা তৈরি করা।
ইতিহাস শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করবে না “হ্যাঁ” জিতেছিল, নাকি “না” জিতেছিল। ইতিহাস জিজ্ঞেস করবে এই সময়ে কে প্রশ্ন তুলেছিল, আর কে নীরব ছিল।
লেখক: ইতিহাস গবেষক ও সাংবাদিক


