প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের আগেই দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে আলোচনায় থাকা ‘চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ (সিইআইজেড) প্রকল্প অনুমোদন পেতে যাচ্ছে। আগামী ৯ জুন মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ‘সাপোর্টিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রজেক্ট ফর চাইনিজ ইকোনমিক জোন’ শীর্ষক প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলতি মাসের ২৩-২৬ তারিখ চার দিনের দ্বিপক্ষীয় সফরে চীন যাবেন। তার এই সফরের আগে এই প্রকল্পটি একনেকের এজেন্ডায় স্থান পেল।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে চীনা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সহজ হবে। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণে সহায়তা মিলবে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
একইসঙ্গে শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বৈদেশিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও এ প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন তারা।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে আনোয়ারা উপজেলার বেলচূড়া এলাকায় প্রায় ৭৮৩ একর জমির ওপর এ শিল্পাঞ্চলটি গড়ে তোলা হচ্ছে। ভৌগোলিক ও বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ অঞ্চলটি কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু টানেল থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
চীনা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলটির অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৫৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা চীনা ঋণ সহায়তা হিসেবে পাওয়া যাবে। অবশিষ্ট অর্থ বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হবে।
সূত্র জানায়, চীনা সরকারের পক্ষে ‘চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন’ (সিআরবিসি) সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে অবকাঠামো নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় জেটি, জেটি থেকে অর্থনৈতিক অঞ্চল পর্যন্ত সংযোগ সড়ক, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) সূত্র জানায়, চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের সময় এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল। তবে দীর্ঘ সময় ধরে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদন না হওয়া, ডেভেলপারের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন না হওয়া ও ডেভেলপার পরিবর্তন এবং অর্থায়নসংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতার কারণে প্রকল্পটি স্থবির হয়ে ছিল।
সূত্র আরও জানায়, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রকল্পটি গ্রহণ করা হলেও পরবর্তী সময়ে এটি ওই সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় ছিল না। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্পটির অগ্রগতি স্থবির হয়ে ছিল। এ ছাড়া, তৎকালীন সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রকল্পটির ডিপিপি অনুমোদন দীর্ঘদিন ধরে আটকে ছিল।
পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফরকে সামনে রেখে চীনের অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়নের জন্য ডিপিপি অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় জোর দেওয়া হয়। বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রকল্পটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আরও জোরদার করে। ফলে, দীর্ঘ এক দশকের স্থবিরতা কাটিয়ে এটি এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে ঋণ সহায়তা পাওয়া নিয়ে জটিলতাও প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের অন্যতম কারণ ছিল বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে বেজার নির্বাহী সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) নজরুল ইসলাম জানান, এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ২০৩১ সালে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বর্তমানে দেশের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আর সে লক্ষ্য পূরণে এ ধরনের বৃহৎ শিল্পভিত্তিক বিনিয়োগ প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
তিনি বলেন, বিপুল ব্যয়ে নির্মিত বঙ্গবন্ধু টানেল এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় ব্যবহার হচ্ছে না। চীনা শিল্পাঞ্চল চালু হলে টানেলটির ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। একই সঙ্গে কর্ণফুলী নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং শিল্পায়নেরও ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটবে।
তিনি আরও বলেন, এখানে মূলত তৈরি পোশাক, গার্মেন্টস অ্যাক্সেসরিজ, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, লেদার এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে সহায়ক বিভিন্ন শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে। বর্তমানে আমদানিনির্ভর অনেক গার্মেন্টস অ্যাক্সেসরিজ স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর ফলে আমদানি নির্ভরতা কমবে, নতুন বিনিয়োগ আসবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
একনেক সভায় অনুমোদনের আগে প্রকল্পের ব্যয়সংক্রান্ত খুঁটিনাটি বিষয়ে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন নজরুল ইসলাম।
তিনি জানান, একনেকে প্রকল্প পর্যালোচনার সময় বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের পরিমাণ সংশোধন, সংযোজন বা বিয়োজন হতে পারে। তবে প্রকল্পটির অর্থায়নে শুধু বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করা হচ্ছে না; বাংলাদেশ সরকারও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করছে।
প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রিতার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রকল্প গ্রহণ করতে হলে অনেক বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। হয়তো এটি সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় ছিল না কিংবা ঋণ পাওয়া যাচ্ছিল না। কেননা, ঋণ পাওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চলছিল।
তা ছাড়া, তখন জাপানের অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্প চলমান থাকায় সরকার হয়তো এটি পরে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এর বাইরে এ বিষয়ে তার আর কিছু জানা নেই বলে জানান নজরুল ইসলাম।
একনেকে উঠছে আরও ১২ প্রকল্প
এদিকে, মঙ্গলবারের একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য মোট ১৩টি নতুন ও সংশোধিত প্রকল্প উপস্থাপন করা হবে। চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল ছাড়াও অন্যান্য প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে বরিশাল সেচ প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়), বৃহত্তর যশোর জেলার জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও টেকসই উন্নয়ন, সমন্বিত উপজেলা ভূমি কমপ্লেক্স নির্মাণ, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের নগর ভবন নির্মাণ, আনোয়ারা-বাঁশখালী-টইটং-পেকুয়া-বদরখালী-চকরিয়া (ইদমনী) আঞ্চলিক মহাসড়ক (আর-১৭০) যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট সম্প্রসারণ প্রকল্প-২।
অন্যদিকে, সংশোধিত ও মেয়াদ বৃদ্ধিসংক্রান্ত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন (তৃতীয় সংশোধন), বাংলাদেশের ৬৪টি জেলায় সার্কিট হাউস ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় নির্মাণ, চাঁদমুখী ও নিকট সংযোজন প্রকল্পের প্রথম সংশোধন ও আন্তখাত ব্যয় সমন্বয় ও মেয়াদ বৃদ্ধি, ঢাকা সিএমএইচে ক্যানসার সেন্টার উন্নয়ন (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পের প্রথম সংশোধন, মাদ্রাসা এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম (এমইএমআইএস) সাপোর্ট প্রকল্পের পঞ্চম সংশোধন, দেশের ৩৪৩টি মাদ্রাসায় মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং গ্রিড উপকেন্দ্র ও সঞ্চালন লাইনের ক্ষমতাবর্ধন প্রকল্পের প্রথম সংশোধন।


