চলমান অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এর প্রথম ১০ দিনে প্রকাশিত নতুন বইয়ের সংখ্যায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে কবিতার বই। মেলার তথ্যকেন্দ্রের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শনিবার মেলার ১০ম দিন পর্যন্ত পর্যন্ত মোট ৭৫৮ টি নতুন বই এসেছে, যার মধ্যে বিষয়ভিত্তিক হিসেবে কবিতা বইয়ের সংখ্যাই সর্বাধিক।
বইগুলোর বিষয়ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি এসেছে কবিতা, যার সংখ্যা ২৬৬টি। উপন্যাস এসেছে ১৩১টি, গল্পগ্রন্থ ৯৪টি, আর প্রবন্ধ ও গবেষণাধর্মী বই ৭৯টি। শিশুসাহিত্য ও ছড়ার সংখ্যা ৫২টি।
এ ছাড়া ভ্রমণ, ধর্ম, সায়েন্স ফিকশনসহ অন্যান্য শাখার বই এসেছে ১৩৬টি। এই প্রকাশনা তালিকা মেলার সাহিত্য, তথ্য ও বিভিন্ন বিষয়ের বৈচিত্র্য প্রতিফলিত হয়েছে।
মেলায় নতুন প্রকাশিত বইগুলোর দাম পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কবিতা ও হালকা প্রবন্ধের বইয়ের দাম সাধারণত ২০০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে, উপন্যাস ও ফিকশনমূলক বই ৩২০ থেকে ৫৫০ টাকার মধ্যে, গবেষণা ও বড় সংকলনের বই ৪৫০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে, আর শিশুতোষ বই ১৫০ থেকে ৩৫০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। উদাহরণস্বরূপ, বাংলা একাডেমির ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ বিষয়ক প্রবন্ধের দাম ১ হাজার টাকা।
মেলায় প্রথম ১০ দিনে মেলায় নতুন বইয়ের প্রবেশ চলমান ধারা দেখাচ্ছে। তথ্যকেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, মেলার দ্বিতীয় দিনে শুক্রবার ১৬টি নতুন বই জমা পড়ে। পরের দিন, মেলার তৃতীয় দিনে শনিবার নতুন বই আসে ৩৮টি। চতুর্থ দিনে রবিবার বই জমা পড়ে ৪২টি এবং মেলার পঞ্চম দিনে সোমবার ৪০টি বই স্টলে আসে।
মেলার ষষ্ঠ দিনে মঙ্গলবার ৬৫টি নতুন বই প্রকাশিত হয়, মেলার সপ্তম দিনে বুধবার আসে ৮১টি বই। বৃহস্পতিবার মেলার অষ্টম দিনে নতুন বই আসে ৯২টি, যা গত কয়েক দিনের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। মেলার নবম দিনে শুক্রবার নতুন বইয়ের সংখ্যা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ১৯৯টিতে। এরপর শনিবার, মেলার দশম দিনে নতুন বই জমা পড়ে ১৮৫টি।
প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বাংলা একাডেমি, যারা মূলত গবেষণা ও প্রবন্ধ প্রকাশে মনোযোগী। এদের তালিকায় অভিধান, লোকজ সংস্কৃতি এবং তাত্ত্বিক বিশ্লেষণমূলক বই সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স প্রথম ১০ দিনে ৩২টি বই প্রকাশ করেছে, যেখানে মূল ফোকাস শিশুসাহিত্য এবং সমকালীন উপন্যাস।
বৃত্তকলা একাডেমি কবিতা এবং তরুণ লেখকদের গল্প প্রকাশে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। কথাপ্রকাশ উন্নতমানের সৃজনশীল উপন্যাস ও ধ্রুপদী অনুবাদ সাহিত্যে জোর দিয়েছে, আর নব সাহিত্য প্রকাশনী কবিতা এবং সমকালীন ছোটগল্পে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
অমর একুশে বইমেলা বইপ্রেমীদের সবচেয়ে বড় উৎসব। একসময় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণই ছিল মেলার প্রাণকেন্দ্র। তবে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ায় ২০১৪ সালে মেলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্প্রসারিত হয়। এরপর থেকে দর্শনার্থীদের ভিড় বেশি দেখা যায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে।
অন্যদিকে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ একদম ফাঁকা, যেন একই মেলার দুই প্রান্তে দুই ভিন্ন দৃশ্য।
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে মূলত সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর প্রকাশনা প্রদর্শন ও বিক্রির স্টল থাকে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনা সংস্থা, গবেষণা কেন্দ্র, কিছু রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও এখানে অংশ নেয়। যেমন বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, ইসলামী ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। মেলার সেমিনার ও সাংস্কৃতিক আয়োজনও সাধারণত এই প্রাঙ্গণেই অনুষ্ঠিত হয়।
অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থাকে বেসরকারি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের স্টল। এখানে লিটল ম্যাগাজিন চত্বর, শিশুদের জন্য বিভিন্ন বইয়ের স্টল এবং খাবারের স্টলও বসে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দর্শনার্থীদের ভিড় বেশি জমে এই অংশে।
বাংলা একাডেমি সূত্রে জানা গেছে, এবারের বইমেলায় মোট ৫৪৯টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে রয়েছে ৮১টি প্রতিষ্ঠান এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান চত্বরে রয়েছে ৪৬৮টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান।
শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সকাল ১১টা থেকেই মেলা শুরু হয়। সকালে শিশুপ্রহরে বাবা-মায়ের হাত ধরে শিশুরা ঘুরে বেড়ায় বিভিন্ন স্টলে। বিশেষ করে ‘কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটার’ স্টলে পুতুলনাচ, হ্যান্ড পাপেট ও বায়োস্কোপকে ঘিরে শিশুদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।
অন্যদিকে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। এখানে দর্শনার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। অনেক স্টলের বিক্রেতাদের অবসর সময় কাটাতে দেখা যায়। মাঝে মধ্যে দু-একজন দর্শনার্থী এলেও বই কেনার দৃশ্য খুব একটা চোখে পড়েনি।


