রাজধানীর কারওয়ান বাজারে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর অফিসে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় তেজগাঁও থানায় করা মামলায় গ্রেপ্তার ১৫ জনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছে আদালত।
সোমবার সন্ধ্যায় শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানার আদালত এই আদেশ দেন। কারাগারে যাওয়া আসামিরা হলেন মো. নাইম ইসলাম (২৫, মো. সাগর ইসলাম (৩৭), মো. আহাদ শেখ (২০), মো. বিপ্লব (২০), মো. নজরুল ইসলাম ওরফে মিনহাজ (২০), মো. জাহাঙ্গীর (২৮), মো. সোহেল মিয়া (২৫), মো. হাসান (২২), মো. রাসেল (২৬), মো. আব্দুল বারেক শেখ ওরফে আলামিন (৩১), মো. রাশেদুল ইসলাম (২৫), মো. সাইদুর রহমান (২৫), আবুল কাশেম (৩৩), মো. প্রাপ্ত সিকদার (২১) ও মো. রাজু আহমেদ (৩৩)।
শুনানিতে আসামি পক্ষের একাংশের আইনজীবী হোসেন আহামাদ বলেন, ‘এই মামলায় গণহারে আসামি করা হয়েছে। আদের অন্যায়ভাবে মামলায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সংবাদ মাধ্যমে হামলার নিন্দা আমরা জানাই। ন্যায়বিচারের স্বার্থে জামিন চাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, এই আসামিদের জামিন শুনানির একটা ডেট চাই। আমরা কি কারণে গ্রেপ্তার তা জানতে চাই। আমরা একটা দ্রুত তদন্ত রিপোর্ট প্রার্থনা করি।
আসামি পক্ষের আরেক আইনজীবী এমদাদুল্লাহ মোল্লাহ বলেন, ‘এই মামলায় প্রথমে ছিল ২০/৩০ জন। ছবির ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করলে প্রকৃত আসামি গ্রেপ্তার হতো। আসামিদের কার বিরুদ্ধে কি অভিযোগ, কোথা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছে সেটা বলা নেই। বারেক রিক্সা চালক তাকে গ্রেপ্তার করা হইছে। নাঈম ইসলাম নিজের টাকা দয়ে টিভি ফ্রিজ কিনেছে কিন্ত তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে বলা হয়েছে লুণ্ঠিত। অন্য আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ নাই, এলিমেন্টস নাই। রিকশাচালক, দোকানদার, বাসা থেকে রাতে রেড দিয়ে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। আসামিরা নির্দোষ তাদের জামিন চাই।
এ সময় শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ‘আমরা চাই না যে ব্যক্তি অপরাধ করেনি তার বিচার হোক। কিন্ত মব সৃষ্টি করে আগুন দেয়া তো ঠিক না। মামলার ধারা জামিন অযোগ্য। মনে করি দেশে সবচেয়ে বেশি যে পত্রিকা প্রচার হয় তা প্রথম আলো। ডেইলি স্টার সারা পৃথিবী ফলো করে। আগুন দেয়া লটপাট, সাংবাদিকদের হত্যার উদ্দ্যেশে এগুলো সম্মান নষ্ট করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘হাদির হত্যাকে কেন্দ্র করে আমরা যখন আলোচনায়, তখন এই ইস্যুকে ম্লান করে দিয়েছে। প্রথম আলোর কাগজসহ তাদের লাইব্রেরি সব লুট করা হয়। আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। সাংবাদিকদের হত্যার হুমকি দেয় ভয়ে তারা ছাদে আশ্রয় নেয়। বিভিন্ন স্থাপনায় তারা ধ্বংস চালায়। অনেক এক্টিভিস্ট এটার পক্ষ নেয়। আনুমানিক ৩২ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘যখন ভাঙচুর শুরু হয়, তখন লাইভ হয়েছে। এই লাইভে দেখা গেছে কারা জড়িত। সেখান থেকেই তাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমরা আসামিদের জেল হাজতে চাচ্ছি।’
এ সময় শুনানি চলামালে হাত জোড় করে এক আসামি বলেন, ‘রিকশা চালায়ে গেরেজে ঢুকছি আর গ্রেপ্তার করেছে। আমরা কোনো অপরাধী না। আমি কোনো ভাঙচুর করিনি। কিছু জানি না।’
মামলার এজহার সূত্রে জানা যায়, দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকা অফিসের হেড অব সিকিউরিটি মেজর (অব.) মো. সাজ্জাদুল কবির তেজগাঁও থানায় এ মামলা দায়ের করেন।
এতে বলা হয়, গত ১৮ ডিসেম্বর রাত ১১ দিকে ২০–৩০ জন অজ্ঞাত দুষ্কৃতকারী দেশীয় অস্ত্র ও দাহ্য পদার্থসহ প্রথম আলো অফিসে হামলার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। বাধার মুখে তারা অফিসের সামনে বেআইনি সমাবেশ করে উস্কানিমূলক স্লোগান দিতে থাকে এবং অনলাইন এক্টিভিস্টদের মাধ্যমে আরও লোক জড়ো হওয়ার আহ্বান জানায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উসকানিতে প্রায় ৩৫০–৪৫০ জন দুষ্কৃতকারী সমবেত হয়ে রাত ১১:৫০টার দিকে কারওয়ান বাজারের প্রথম আলো কার্যালয়ে হামলা চালায়।
হামলাকারীরা গেটের শাটার ও কাচ ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে আসবাবপত্র, সরঞ্জাম, নথিপত্রসহ বিভিন্ন জিনিস ভাঙচুর ও লুটপাট করে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। ভবনের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নষ্ট করা হয়, সিসিটিভি ফুটেজ ধ্বংস করা হয় এবং ফায়ার সার্ভিসকে কাজে বাধা দেওয়া হয়। আগুনে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, নথিপত্র, সার্ভার, আর্থিক দলিলসহ প্রতিষ্ঠানের মোট প্রায় ৩২ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। এ ঘটনায় ১৯ ডিসেম্বর প্রথম আলোর মুদ্রিত সংস্করণ ও অনলাইন কার্যক্রম বন্ধ থাকে।
তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে একাধিক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার নাইম ইসলামের কাছ থেকে লুণ্ঠিত ৫০ হাজার টাকা, একটি ফ্রিজ ও একটি এলইডি টিভি উদ্ধার করা হয়েছে। মামলার তদন্ত চলমান; আসামিদের ঠিকানা যাচাই হয়নি। তদন্তের স্বার্থে তাদের জেলহাজতে আটক রাখা এবং লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধারে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়।


