‘পূর্ণ রাজ্যের’ মর্যাদার দাবিতে চলমান ‘জেন জি’ বিক্ষোভে সহিংসতার ঘটনায় ভারতের লাদাখকে কড়া নিরাপত্তার চাদরে মোড়ানো হয়েছে। পর্যটকের আনাগোনায় ভরা শহরটিতে এখন যেন পিনপতন নীরবতা। বেশিরভাগ প্রধান সড়কই কাঁটাতারের ব্যারিকেড দিয়ে অবরুদ্ধ রেখেছে নিরাপত্তাকর্মীরা। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে লেহসহ লাদাখের অন্য প্রশাসনিক অঞ্চলগুলোতে নিয়মিত বিরতিতে টহল দিচ্ছে পুলিশ।
একপ্রেস ট্রিবিউনের খবরে বলা হয়, পাহাড় এবং বরফে আচ্ছাদিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আঁধার লাদাখ একটি ‘কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল’। এ অঞ্চলের বাসিন্দারা ভারতের সংসদে আইনপ্রণেতা নির্বাচিত করতে পারে। তবে অঞ্চলটির সব ধরনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কেন্দ্র সরকার নেয়।
২০১৯ সালে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার জম্মু-কাশ্মীরের ‘রাজ্য স্বীকৃতির’ বিশেষ মর্যাদা বাতিল করার পর ৫০ শতাংশ মুসলিম এবং প্রায় ৪০ শতাংশ বৌদ্ধ ধর্মানুসারীর লাদাখ আলাদা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসাবে স্বীকৃতি পায়। লাদাখ অ্যাপেক্স বডি (এলএবি) ও কারগিল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (কেডিএ) চার বছর ধরে ‘পূর্ণ রাজ্য’ মর্যাদা পাওয়ার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছে।

লাদাখকে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের আওতাভুক্ত করে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়ার পাশাপাশি অঞ্চলটির জন্য একটি পৃথক পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠনের দাবি জানান স্থানীয়রা। সেই সঙ্গে লেহ এবং কার্গিল জেলার জন্য পৃথক লোকসভা আসন চেয়ে একাধিকবার অনশনেও বসেছেন বিক্ষুব্ধরা।
এবার তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন লাদাখের তরুণ ছাত্র-জনতা। তাদের ‘জেন জি’ স্টাইল বিক্ষোভের সঙ্গে নেপালের সাম্প্রতিক বিক্ষোভের মিল খুঁজে পাওয়ার দাবি জানিয়েছে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। আর ওই বিক্ষোভের পেছনে ‘মদদদাতা’ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে লাদাখের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব সোনাম ওয়াংচুককে।
তিনি একাধারে প্রকৌশলী, ‘স্তুপা আর্টিফিশিয়াল গ্লেসিয়ার’ নামক কৃত্রিম হিমবাহের উদ্ভাবক এবং লাদাখের আন্তঃহিমালয় অঞ্চলে ‘শিক্ষা সংস্কার’ নিয়ে কাজ করা এক পরিচিত মুখ। তার জীবনের ওপর ভিত্তি করেই নির্মিত হয় বিশ্বনন্দিত বলিউড সিনেমা ‘থ্রি ইডিয়টস’।

ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে এনডিটিভি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘লাদাখের অনেক নেতা উত্তেজিত ছাত্র-জনতাকে অনশন কর্মসূচি প্রত্যাহার করে ঘরে ফেরার আহ্বান জানানোর পরও সোনাম ওয়াংচুক তা চালিয়ে গেছেন।’
ওয়াংচুক আরব বসন্তের আদলে ও নেপালের জেন জি প্রজন্মের আন্দোলনে সরকার পতনের উদাহরণ টেনে মানুষকে আরও প্ররোচিত করেছেন বলেও অভিযোগ তুলেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার।
গত বছরের মার্চ মাসে লাদাখকে রাজ্য মর্যাদার দাবিতে ২১ দিন অনশন করেন সোনাম। ওই বছরেরই অক্টোবরে দিল্লির লাদাখ ভবনের সামনে ফের অনশনে বসেন তিনি। সেখান থেকে তাকে থানাতেও তুলে নিয়ে যায় দিল্লি পুলিশ। কিন্তু তাতেও দমানো যায়নি সোনাম ও তার সমর্থকদের। কেন্দ্র সরকার আন্দোলনরতদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মুখোমুখি আলোচনায় বসার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরই কেবল তারা অনশন ভেঙে ঘরে ফেরেন।
তবে লাদাখের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সরকারের পক্ষ থেকে গঠিত কমিটির সঙ্গে মতবিরোধের জেরে গত ১৫ দিনের বেশি সময় ধরে সোনাম ওয়াংচুকের নেতৃত্বে ফের অনশন শুরু করেছেন আন্দোলনকারীরা। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় লেহ শহর অচল করে দেওয়ার ডাক দিলে বিক্ষুব্ধদের আন্দোলনে উত্তেজনা বাড়তে থাকে।

এ সময় আন্দোলনে পুলিশ বাধা দিলে তা সহিংসতায় গড়ায়। এতে অন্তত পাঁচজন নিহত ও ৭০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ৩০ জনের বেশি পুলিশ সদস্যও রয়েছেন।
বিক্ষোভকারীরা পুলিশের যানবাহনে আগুন দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় হিন্দু-জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কার্যালয়েও আগুন দেয়। এক বিবৃতিতে কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ‘আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হয়। এতে দুর্ভাগ্যজনকভাবে কিছু প্রাণহানি ঘটে।’


