পারমাণবিক প্রকৌশলী আফরোজা শেলী বলেছেন, পারমাণবিক বিশ্বে বাংলাদেশের প্রবেশ শুধু কোনো সুযোগ নয়, বরং তা বৈশ্বিক পরিসরে বাড়তি নজরদারি ও দায়বদ্ধতা নিয়ে আসে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এই অধ্যাপক বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে পূর্ণ স্বনির্ভরতা রাতারাতি অর্জন করা সম্ভব নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আগামী বছরগুলোতে রাশিয়ার রোসাটমের ওপর নির্ভরতার পাশাপাশি দেশের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
রূপপুরে ব্যবহৃত ভিভিইআর-১২০০ রিয়্যাক্টর প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণায় যুক্ত আফরোজা শেলী বলেন, এমন একাডেমিক ও প্রযুক্তিগত কাজ দেশের নিজস্ব পারমাণবিক দক্ষতা গড়ে তোলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
টাইমস অব বাংলাদেশের নাহিয়ান আহমেদের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে সীমাবদ্ধ না রেখে আশপাশের জনগোষ্ঠী পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে, যাতে স্থানীয় মানুষ সচেতন, প্রশিক্ষিত এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত থাকে।
রূপপুরে জ্বালানি লোডিং শুরু হয়েছে। উৎপাদন শুরুর আগে বাকি ধাপগুলো কী?
জ্বালানি লোডিংয়ের মাধ্যমে রিয়্যাক্টর তার প্রাথমিক চালু হওয়ার ধাপে প্রবেশ করে। পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ হতে প্রায় ৪৫ দিন সময় লাগতে পারে। এরপর রিয়্যাক্টরকে ন্যূনতম নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার পর্যায়ে নেওয়া হবে।
এরপর আরও কিছু ধাপ রয়েছে-রিয়্যাক্টর ফিজিক্স পরীক্ষা, যন্ত্রপাতি ক্যালিব্রেশন, নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষা ব্যবস্থার যাচাই, স্বল্প ক্ষমতায় ফিজিক্স পরীক্ষা, ধাপে ধাপে ক্ষমতা বৃদ্ধি, গ্রিডে সংযোগ এবং চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রক অনুমোদন নেওয়া।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তায় কতটা প্রভাব ফেলবে?
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার জন্য পারমাণবিক বিদ্যুৎ দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি বৈচিত্র্য আনার একটি উপায়। ২০৪১ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক জ্বালানির অংশ ১২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
রূপপুরের দুটি ইউনিট চালু হলে জাতীয় গ্রিডে ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে, যা প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর চাপ কমাবে।
পারমাণবিক জ্বালানির পরিমাণ খুব কম হলেও এর শক্তিঘনত্ব অনেক বেশি। ফলে কয়লা বা গ্যাসের মতো মাসভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহ পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করতে হয় না। তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ অন্যান্য সব জ্বালানির বিকল্প নয়।
গ্যাস, তেল ও কয়লার দামের বৈশ্বিক ওঠানামা পারমাণবিক জ্বালানিতে কতটা প্রভাব ফেলে?
ততটা নয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির দামের ওঠানামার প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম। গ্যাস, তেল বা কয়লার দামের বড় পরিবর্তন সরাসরি পারমাণবিক বিদ্যুতের খরচে তেমন প্রভাব ফেলে না।
তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, জ্বালানি প্রস্তুতকরণ, নিয়ন্ত্রক মানদণ্ড, বীমা, ব্যবহৃত জ্বালানির নিষ্পত্তি এবং পরিবহনের খরচ কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে।
মূল ঝুঁকি থাকে মূলধনী ব্যয়, অর্থায়ন খরচ, বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকা ব্যবস্থাপনা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে।
ভারতে কম খরচে পারমাণবিক কেন্দ্র নির্মাণ সম্ভব হয়েছে। রূপপুরে খরচ বেশি কেন?
এখানে তুলনা সতর্কতার সঙ্গে করতে হবে। ভারতের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো নিজস্ব সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভরশীল এবং তাদের নিজস্ব প্রেসারাইজড হেভি ওয়াটার রিয়্যাক্টর প্রযুক্তির ঐতিহ্য রয়েছে।
বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো রাশিয়ার উন্নত তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তি গ্রহণ করছে।
একটি নতুন দেশের জন্য ‘ফার্স্ট-অব-এ-কাইন্ড’ প্রকল্প হওয়ায় অবকাঠামো গড়ে তোলা, নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা তৈরি, সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক, প্রশিক্ষণ, মাননিয়ন্ত্রণ ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় খরচ বেশি হয়।
এই প্রকল্পের অর্থায়ন কাঠামোতেও পর্থক্য রয়েছে। পুরো প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছেন ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। তার মধ্যে ৯০ শতাংশ বা ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার ছিল রাশিয়ার ঋণ। খরচ আর কী কারণে বেড়েছে?
রূপপুর প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার, যার ৯০ শতাংশ বা ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার রাশিয়ার ঋণ।
এই ব্যয়ের মধ্যে শুধু রিয়্যাক্টরের দাম নয়, শেখার প্রক্রিয়া, আমদানি করা প্রযুক্তি, অর্থায়ন খরচ, সময় বিলম্ব, অবকাঠামো নির্মাণ এবং উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত।
রূপপুর প্রকল্প আমাদের জনবল কতটা দক্ষ করেছে? রোসাটমের ওপর নির্ভরতা কতদিন থাকবে?
রূপপুর প্রকল্প মানবসম্পদ উন্নয়নের বড় একটি ক্ষেত্র তৈরি করেছে। দুটি ইউনিট পরিচালনার জন্য ১,৯২৭ জন জনবল চিহ্নিত করা হয়েছে।
এর মধ্যে ১,১১৯ জনের প্রশিক্ষণ নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ৮৫১ জনকে রাশিয়ায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
রূপপুর পরিচালনার জন্য নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (NPCBL) গঠন করা হয়েছে।
দক্ষ জনবল তৈরির জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে স্নাতক পর্যায়ে নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং চালু হয়েছে।
আমরা কি কখনো পুরোপুরি স্বনির্ভর হতে পারব?
পারমাণবিক খাতে পূর্ণ স্বনির্ভরতা একটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। নতুন দেশ হিসেবে এটি এক-দুই বছরে সম্ভব নয়, ধীরে ধীরে গড়ে তুলতে হবে।
পরিচালনা দল, বিকিরণ সুরক্ষা, রসায়ন, যন্ত্রপাতি নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা এবং জরুরি প্রস্তুতির মতো ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে দেশীয় দক্ষতা তৈরি হবে।
তবে জ্বালানি সরবরাহ, বিশেষ যন্ত্রপাতি বা বড় ধরনের সংস্কারের ক্ষেত্রে পুরোপুরি বিদেশি নির্ভরতা দূর করা খুব কঠিন, যা নতুন পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে স্বাভাবিক বিষয়।
চেরনোবিল ও ফুকুশিমার অভিজ্ঞতা মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি করেছে। রূপপুর কতটা নিরাপদ?
রূপপুরের ভিভিইআর-১২০০ নকশায় ফুকুশিমা-পরবর্তী শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এতে বিদ্যুৎ ছাড়াই দীর্ঘমেয়াদি কোর কুলিং, ক্ষয় তাপ অপসারণ এবং কোর গলে গেলেও কনটেইনমেন্ট অক্ষুণ্ণ রাখার ব্যবস্থা রয়েছে।
ডাবল কনটেইনমেন্ট, প্যাসিভ সেফটি, জরুরি কুলিং এবং কোর ক্যাচারের মতো উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। ‘নিরাপদ’ মানে ‘ঝুঁকিমুক্ত’ নয়, তবে তৃতীয় প্রজন্মের রিয়্যাক্টরে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা ও প্রভাব অনেক কম।
ভূমিকম্পপ্রবণ দেশে পদ্মার তীরে এই প্রকল্প কতটা নিরাপদ?
স্থান নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ভূমিকম্প ঝুঁকি, মাটির স্থিতিশীলতা, বন্যা সুরক্ষা এবং ভূগর্ভস্থ পানির বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
২০২২ সালের বাংলাদেশ নিউক্লিয়ার সেফটি কনভেনশন প্রতিবেদনে মাটি স্থিতিশীলকরণ, গভীর মাটি মিশ্রণ এবং বন্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থার কথা উল্লেখ রয়েছে।
নকশায় সম্ভাব্য বন্যা ও ভূগর্ভস্থ পানির ঝুঁকি মোকাবিলার প্রকৌশল ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
স্থানীয় মানুষের জন্য কী করণীয় ও বর্জনীয়?
জরুরি পরিকল্পনা শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে নয়, আশপাশের জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছাতে হবে।
করণীয় হলো—সরকারি নির্দেশনা মানা, নিরাপদ স্থান জানা, জরুরি তথ্যের উৎস অনুসরণ করা এবং গুজব যাচাই করা।
বর্জনীয় হলো—গুজব ছড়ানো, নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ, অনুমতি ছাড়া সরিয়ে নেওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করা এবং আতঙ্ক ছড়ানো আচরণ করা।
রেডিওঅ্যাকটিভ বর্জ্য রাশিয়ায় নেওয়ার সময় কী ধরনের সতর্কতা দরকার?
স্থল, জল বা আকাশপথ—সব ক্ষেত্রেই তেজস্ক্রিয় পদার্থ পরিবহনের জন্য আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামো রয়েছে।
প্যাকেজিং, প্রেরণ, লোডিং, পরিবহন, সংরক্ষণ এবং আনলোডিং—সব ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।
ব্যবহৃত জ্বালানি পরিবহনের পাত্র এমনভাবে তৈরি, যাতে দুর্ঘটনা ঘটলেও তেজস্ক্রিয়তা বাইরে না আসে।
তবে এটিই চূড়ান্ত সমাধান নয়। অস্থায়ী সংরক্ষণ, জাতীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কৌশল, তহবিল এবং নিয়ন্ত্রক নজরদারি জোরদার করা জরুরি।
পারমাণবিক খাতে প্রবেশ কি কোনো জটিলতা তৈরি করতে পারে?
মূল জটিলতা শাসনব্যবস্থা, নিরাপত্তা, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং ভূরাজনীতিকে ঘিরে।
বাংলাদেশ ১৯৮২ সাল থেকে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থfর নিরাপত্তা চুক্তির আওতায় রয়েছে এবং ২০০১ সাল থেকে অতিরিক্ত প্রটোকল কার্যকর।
এই কাঠামো শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের নিশ্চয়তা দেয়। মূল কাজ হলো স্বচ্ছতা বজায় রাখা, নিয়ন্ত্রক স্বাধীনতা শক্তিশালী করা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলায় নিয়ম মানা।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি কি রাশিয়া থেকে জ্বালানি আনতে বাধা হবে?
চুক্তিতে একটি শর্ত রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক জ্বালানি বা প্রযুক্তি কেনা যাবে না।
তবে বিদ্যমান প্রকল্প বা আগের চুক্তির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রয়েছে।
এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি নীতিগত ঝুঁকি হতে পারে, তবে রূপপুর প্রকল্পে এর প্রভাব পড়বে না।
বাংলাদেশে ইউরেনিয়াম বা থোরিয়ামের মজুত পাওয়ার সম্ভাবনা কতটা?
এখন পর্যন্ত এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই, যা দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে ব্যবহারযোগ্য ইউরেনিয়াম মজুতের কথা বলা যায়।
কক্সবাজারের সমুদ্রতটের বালি, সিলেটের কিছু শিলাস্তর এবং ভারী খনিজে ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামের উপস্থিতির সম্ভাবনার কথা গবেষণায় এসেছে।
তবে সম্ভাবনা মানেই নিশ্চিত মজুত নয়।


