মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের ‘অজুহাত’ দেখিয়ে দেশের বেশিরভাগ জ্বালানি সরবরাহের পাম্পগুলোতে টাঙানো হয়েছে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড। জরুরি প্রয়োজনেও যানবাহনের জন্য ডিজেল, পেট্রোল কিংবা কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন হাজারও মানুষ। পাম্পের সামনে ‘তেল নেই’ বোর্ড দেখে অনেক চালকই আবার ছুটে যাচ্ছেন দূর-দূরান্তের কোনো পাম্পে।
অথচ সরকারের পক্ষ থেকে বারবারই বলা হচ্ছে, দেশে তেলের কোনো সংকট নেই, রয়েছে পর্যাপ্ত মজুদ। তবুও দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের এমন হাহাকারের ঘটনায় অবৈধ মজুতএবং কালোবাজারিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জ্বালানি তেল নিয়ে সিন্ডিকেট ও কালোবাজারির দোরাত্ম্য থামাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযান শুরু করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
শুক্রবার দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে এমনই এক অভিযানে ‘তেল নেই’ লেখা পাম্পে অভিযান চালিয়ে ৯৭৮৩ লিটার জ্বালানি গোপনে মজুতঅবস্থায় খুঁজে পায় ভ্রাম্যমাণ আদালত।
অবৈধ মজুদের ঘটনায় উপজেলার পার্বতীপুর ইউনিয়নের বড়দাদপুর এলাকার মেসার্স ব্রাদার্স অ্যান্ড সিস্টার্স ফিলিং স্টেশনকে জরিমানা ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

ভ্রাম্যমাণ আদালতে নেতৃত্ব দেওয়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও গোমস্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাকির মুন্সী জানান, মেসার্স ব্রাদার্স অ্যান্ড সিস্টার্স ফিলিং স্টেশন ‘পাম্পে তেল নেই’ ব্যানার ঝুলিয়ে দিয়ে জ্বালানি তেল বিক্রি বন্ধ করে দেয়। বিষয়টি জানতে পেরে ভ্রাম্যমাণ আদালত ওই পাম্পে যায় এবং তেলের মজুত যাচাই করেন।
এ সময় পাম্পের নিচে হাউসের নিচে দুই হাজার ৩৬৮ লিটার পেট্রোল, তিন হাজার ৭৬০ লিটার ডিজেল এবং তিন হাজার ৬৫৫ লিটার অকটেন মজুত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘মজুত থাকা সত্ত্বেও বিক্রি না করার অপরাধে ওই পেট্রোল পাম্পকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জনস্বার্থে এমন অভিযান অব্যহত থাকবে।’
নীলফামারী
একইভাবে নীলফামারীর রামগঞ্জ বাজারে খোলা দোকানে অবৈধভাবে ও অতিরিক্ত দামে পেট্রোল বিক্রির অভিযোগে অভিযান চালিয়ে দুই ব্যবসায়ীকে জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের যৌথ উদ্যোগে এ অভিযান পরিচালিত হয়।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে খবর পাওয়া যায় রামগঞ্জ বাজার এলাকায় অনুমোদনহীনভাবে খোলা দোকানে জ্বালানি তেল বিক্রি করা হচ্ছে। নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি মূল্যে পেট্রোল বিক্রি করে সাধারণ ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে এমন অভিযোগের ভিত্তিতে নীলফামারী জেলা পুলিশ সেখানে তাৎক্ষণিক অভিযান চালায়।
এ সময় অবৈধভাবে জ্বালানি তেল বিক্রির দায়ে মো. রবিউল ইসলাম নামের এক ব্যবসায়ীকে ২০ হাজার টাকা এবং মো. জাহাঙ্গীর আলমকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
অভিযানে দুটি দোকান থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পেট্রোল জব্দ করা হয়। পরে জব্দকৃত তেল সরকার নির্ধারিত মূল্যে নিবন্ধন ও হেলমেটধারী মোটরসাইকেল চালকদের কাছে বিক্রি করা হয়। সেই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
নেত্রোকোনা
নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে মজুতরাখা ৮০০ লিটার পেট্রোল জব্দ করেছে প্রশাসন। একই সঙ্গে লাইসেন্স ছাড়া অতিরিক্ত দামে খুচরা জ্বালানি বিক্রির দায়ে এক ব্যবসায়ীকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
কেন্দুয়া উপজেলার রামপুর বাজারে শুক্রবার সন্ধ্যায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. রিফাতুল ইসলামের নেতৃত্বে অভিযান চালায় ভ্রাম্যমাণ আদালত।
এ সময় ব্যবসায়ী এনায়েতুর রহমানের গুদাম থেকে ড্রামে সংরক্ষিত ৮০০ লিটার পেট্রোল উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তিনি জ্বালানি তেলের চলমান সংকটের সুযোগ নিয়ে এসব পেট্রোল অবৈধভাবে মজুতকরে লাইসেন্স ছাড়াই বেশি দামে বিক্রি করছিলেন।

ঘটনার সত্যতা পাওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে পেট্রোলিয়াম আইন ২০১৬ অনুযায়ী ১০ হাজার টাকা এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ অনুযায়ী ৩০ হাজার টাকা- মোট ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করে।
জব্দ করা পেট্রোল শনিবার সকাল ১০টা থেকে সরকার নির্ধারিত মূল্যে ও নির্ধারিত পরিমাণ অনুযায়ী রামপুর বাজারে প্রকাশ্যে বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কেন্দুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান ইউএনও মো. রিফাতুল ইসলাম।
মাগুরা

মাগুরা সদর উপজেলার নড়িহাটি গ্রাম থেকে শুক্রবার রাতে অবৈধ মজুত করা ৯০০ লিটার ডিজেলসহ দুইজনকে আটক করেছে পুলিশ।
মাগুরা সদর থানার ওসি (তদন্ত) মো: আবু বকর জানান, পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেনের নির্দেশনায় শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নড়িহাটি গ্রামের কাসেম মোল্লার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন পাত্রে মজুত ৯০০ লিটার ডিজেল উদ্ধার করা হয়।
এ সময় কাশেম মোল্লা ও তার ছেলে ইসমাইল মোল্লাকেও আটক করা হয়। তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে তারা অবৈধভাবে এ ডিজেল মজুত করেন। এ বিষয়ে মাগুরা সদর থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।
গাইবান্ধা

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে কালোবাজারে বেশী দামে তেল বিক্রির অভিযোগে এক ফিলিং স্টেশনের (পাম্প) ম্যানেজারকে পাঁচ দিনের কারাদন্ড ও খুচরা বিক্রেতাকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
শক্রবার রাতে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সৈয়দা ইয়াসমিন সুলতানা ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে এ দুই আদেশ দেন।
অভিযানে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ -ঘোড়াঘাট সড়কের মৌসুমী ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার আহসান হাবিব নয়নকে কালোবাজারে বেশী দামে জ্বালানী তেল বিক্রির দায়ে পাঁচ দিনের কারাদন্ড দেন। এছাড়া উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নের কাটামোড়ে সরকার নির্ধারিত মূল্যর চেয়ে বিক্রির দায়ে খুচরা তেল বিক্রেতা হেলাল উদ্দিনকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেন।
এদিকে তেলের দুষ্প্রাপ্যতায় এক ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা গেছে নীলফামারীতে। তেল ফুরিয়ে যাওয়ায় মোটরসাইকেলের ট্যাংকার খুলেই পাম্পে দেখা যায় দুই যুবককে।
সাধারণত মোটরসাইকেলের তেল ফুরিয়ে গেলে চালকেরা সেটি ঠেলে নিকটবর্তী পাম্পে নিয়ে যান। তবে ডোমার-নীলফামারি সড়কের একটি ফিলিং স্টেশনে দেখা যায় ব্যতিক্রমী এক চিত্র।

ট্যাংকি খুলে তেল নিতে আসা যুবক লাবণ্য রায় বলেন, তার মা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কর্মী। প্রতিদিন মোটরসাইকেলে করেই তাকে অফিসে যাতায়াত করতে হয়। শুক্রবার বিকেলে জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়ার সময় হঠাৎ বাইকের তেল শেষ হয়ে যায়। আশপাশে কোনো ফিলিং স্টেশন না থাকায় মটরসাইকেল ঠেলে নেওয়া সম্ভব হয়নি। তাই দ্রুত সমাধানের জন্য তিনি ট্যাংকি খুলে পাম্পে নিয়ে এসে তেল সংগ্রহ করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এমন দৃশ্য তারা আগে খুব একটা দেখেননি। কেউ কেউ এটিকে তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তার উদাহরণ হিসেবে দেখলেও, অনেকেই আবার এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ও নিয়মবহির্ভূত বলে মন্তব্য করেন। তাদের মতে, খোলা অবস্থায় তেলের ট্যাংকি বহন করা অগ্নিঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং এটি নিরাপত্তা বিধির পরিপন্থী।


