চলতি ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার মধ্যকার গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচটি ঘিরে ফুটবল বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়েছে। গ্রুপ ‘জে’-এর এই ম্যাচটি ৩-৩ গোলে ড্র হওয়ার পর, উভয় দলই নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে। তবে ম্যাচটি ‘পাতানো’ বলে ইঙ্গিত করেছে বিভিন্ন মহল।
এমন সন্দেহের কারণ ছিল ‘জি’ গ্রুপের ইরান। সমীকরণটি এমন ছিল: ‘জে’ গ্রুপের এই ম্যাচ ড্র না হলে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিত পরাজিত দল। আর অষ্টম সেরা তৃতীয় দল হিসেবে নকআউট পর্বে যেত ইরান।
অন্যদিকে ম্যাচটি ড্র হলে গ্রুপে দ্বিতীয় হয়ে অষ্ট্রিয়া এবং অষ্টম সেরা তৃতীয় দল হিসেবে নকআউট পর্বে যাবে আলজেরিয়া। শেষ পর্যন্ত হয়েছেও তাই।
ফুটবল বোদ্ধাদের একাংশ আশঙ্কা করেছিলেন, নকআউট পর্বে যাওয়ার সহজ সমীকরণে দুই দলই হয়তো কোনো ঝুঁকি না নিয়ে ড্র করার লক্ষ্যেই মাঠে নামবে। আর এমন সমীকরণের কারণেই আলজেরিয়া-অস্ট্রিয়া ম্যাচটি পাতানো বলে অভিযোগ ওঠে।
তবে ম্যাচ শেষে এই ধরনের সব অভিযোগ পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন অস্ট্রিয়ার প্রধান কোচ রালফ রাংনিক। তিনি এই ম্যাচকে তার দীর্ঘ কোচিং ক্যারিয়ারের অন্যতম রোমাঞ্চকর এবং অবিশ্বাস্য একটি ম্যাচ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
অবশ্য মাঠের লড়াইয়ে যে নাটকীয়তা দেখা গেছে, তাকে পাতানো ম্যাচ হিসেবে সন্দেহ করতে পারে যে কেউ। ম্যাচের প্রথমার্ধে ২৮ মিনিটে মার্কো আরনাউতোভিচের গোলে অস্ট্রিয়া এগিয়ে গেলেও প্রথমার্ধের একেবারে শেষ মুহূর্তে রফিক বেলঘালির গোলে সমতায় ফেরে আলজেরিয়া। দ্বিতীয়ার্ধের ৫৫ মিনিটে মার্সেল সাবিটজারের গোলে অস্ট্রিয়া আবারও লিড নেয়, কিন্তু মাত্র পাঁচ মিনিট পর আলজেরিয়ার অধিনায়ক রিয়াদ মাহরেজ গোল করে ম্যাচটিকে ২-২ ব্যবধানে নিয়ে আসেন।
এরপর থেকে উভয় দলই কিছুটা রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলতে শুরু করলে স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকরা ভুয়ো ধ্বনি দিতে থাকেন, যা ম্যাচ পাতানোর সন্দেহকে আরও উস্কে দেয়।
তবে আসল নাটকীয়তা তখনও বাকি ছিল, যা শুরু হয় ইনজুরি টাইমে। ৯০+৩ মিনিটে রিয়াদ মাহরেজ আলজেরিয়ার হয়ে তৃতীয় গোলটি করলে অস্ট্রিয়ার বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় এবং ইরান পরবর্তী পর্বে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছিল। এই চরম মুহূর্তে অস্ট্রিয়ার কোচ রালফ রাংনিক শেষ চাল হিসেবে মাঠে নামান দীর্ঘদেহী স্ট্রাইকার সাসা কালাডজিচকে। মাঠে নামার ঠিক এক মিনিটের মাথায়, ৯০+৬ মিনিটে কালাডজিচ হেডের সাহায্যে এক অবিশ্বাস্য গোল করে অস্ট্রিয়াকে সমতায় ফেরান এবং নিশ্চিত পরাজয়ের মুখ থেকে দলকে নকআউট পর্বে নিয়ে যান।
এই ড্রয়ের ফলে আলজেরিয়া এবং অস্ট্রিয়া দুই দলই নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয়, আর কপাল পোড়ে ইরানের।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে অস্ট্রিয়ার কোচ রালফ রাংনিক তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করে ম্যাচ পাতানোর অভিযোগের জবাব দেন। রাংনিক স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ইনজুরি টাইমের এই নাটকীয় পটপরিবর্তনের পর কোনো বিবেকবান মানুষ এই ম্যাচকে পাতানো বা পূর্ব-পরিকল্পিত বলতে পারে না।
তিনি বলেন, তার প্রায় ৪০ বছরের দীর্ঘ কোচিং ক্যারিয়ারে এমন অবিশ্বাস্য এবং ওঠানামায় ভরা ম্যাচ তিনি খুব কমই দেখেছেন। যদি সত্যিই ম্যাচটি পাতানো হতো, তবে আলজেরিয়া ইনজুরি টাইমে গোল করে অস্ট্রিয়াকে প্রায় বিদায় করে দেওয়ার মতো ঝুঁকি নিত না এবং অস্ট্রিয়াকেও শেষ সেকেন্ডের জাদুর ওপর নির্ভর করতে হতো না। রাংনিক ড্রেসিংরুমের ভেতরের আবেগকে সম্পূর্ণ উন্মাদনা বলে বর্ণনা করে একে এমন এক চলচ্চিত্র নাটকের সঙ্গে তুলনা করেন যা আগে থেকে লিখে রাখা অসম্ভব।
এই ম্যাচের পর ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপের সেই কুখ্যাত স্পেনের ‘গিজনের কলঙ্ক’ ম্যাচের স্মৃতি রোমন্থন করছিলেন ফুটবল অঙ্গণের অনেকে। সেবার পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার এক বিতর্কিত ম্যাচের কারণে আলজেরিয়া টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গিয়েছিল।
তবে রাংনিক দৃঢ়তার সঙ্গে জানান, ৪৪ বছর আগের সেই ঘটনার সঙ্গে এই দলের কোনো খেলোয়াড়ের সুদূরতম সম্পর্কও নেই, কারণ বর্তমান দলের কেউই তখন জন্মগ্রহণ করেননি। মাঠের এই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই প্রমাণ করেছে যে, উভয় দলই জেতার জন্য জানপ্রাণ দিয়ে লড়েছে এবং শেষ পর্যন্ত ফুটবলের জয় হয়েছে।


