বিদেশে পাচার করা অর্থ উদ্ধারে আইনি পদক্ষেপ হিসেবে বহুল আলোচিত এস আলম ও বেক্সিমকো গ্রুপের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে নিয়েছে সরকার।
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, এস আলম গ্রুপের পাচারকৃত সম্পদ উদ্ধারে ৪টি দেশে এবং বেক্সিমকো গ্রুপের জন্য ২টি দেশে ‘মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট’পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশের সম্পদ অনুসন্ধানে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ৪টি স্বনামধন্য বিদেশি আইনি প্রতিষ্ঠান।
মঙ্গলবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে অর্থমন্ত্রী এই তথ্যগুলো তুলে ধরেন।
সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাতের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ইসলামী ব্যাংকের বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণের বড় অংশই এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। অন্যদিকে, জনতা ব্যাংকে বেক্সিমকো গ্রুপের বড় অংকের খেলাপি ঋণ রয়েছে।
রাজনৈতিক সমঝোতার সুযোগ নেই
এস আলম গ্রুপের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হচ্ছে কি না—এমন সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন যে, বিএনপির রাজনীতিতে অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা বা দুর্নীতির সঙ্গে আপস করার কোনো সুযোগ নেই।
তিনি দাবি করেন, অতীতে বিএনপি যখনই ক্ষমতায় ছিল, আর্থিক শৃঙ্খলা ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় ছিল। যারা ব্যাংক লুটে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং সরকারি পর্যায়ে আলোচনার পাশাপাশি পেশাদার ফার্মের মাধ্যমে অর্থ পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে।
তদন্ত ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
পাচারকৃত সম্পদ উদ্ধারের লক্ষে দুদক, সিআইডি ও শুল্ক গোয়েন্দাসহ একটি যৌথ তদন্তকারী দল কাজ করছে। এস আলম গ্রুপের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, সাইপ্রাস, জার্সি ও সিঙ্গাপুরে এবং বেক্সিমকো গ্রুপের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে আইনি অনুরোধ পাঠানো হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল প্রক্রিয়া। বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত চলতি অর্থবছরে ঠিক কী পরিমাণ অর্থ উদ্ধার হবে, তার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বলা সম্ভব নয়।
বৈদেশিক ঋণ ও ব্যাংক খাতের অবস্থা
সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবে জানানো হয়, গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি প্রায় ৭৮ হাজার ৬৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অন্যদিকে, ব্যাংক খাত পুনর্গঠনে সরকার বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর সহায়তা নিচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেন, বর্তমানে আর্থিক খাতে বড় ধরনের পুঁজি সংকট রয়েছে, যা গত কয়েক বছরে মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও পুঁজি পাচারের কারণে তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগামী বাজেটগুলোতে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হবে।
ঋণের দায় ও রাজস্ব পরিকল্পনা
ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এই ঋণের বোঝা মূলত বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ধারাবাহিকতা। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হলো স্থানীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমিয়ে আনা। রাজস্ব বৃদ্ধি এবং করের আওতা বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতিকে শক্তিশালী অবস্থানে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
একীভূত ব্যাংকের আমানতকারীদের সুরক্ষা
দুর্দশাগ্রস্ত ও একীভূত হওয়া ৫টি ব্যাংকের আমানতকারীদের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ ২০২৫-এর আওতায় প্রাথমিকভাবে প্রত্যেক অপ্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীকে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত পরিশোধ করা হচ্ছে। তবে মানবিক দিক বিবেচনা করে ক্যানসার, কিডনি ডায়ালাইসিস বা হার্ট অপারেশনের মতো গুরুতর রোগে আক্রান্ত গ্রাহকদের প্রয়োজনে অতিরিক্ত অর্থ ছাড়ের বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় রাখা হয়েছে। অবশিষ্ট টাকা স্কিম অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করা হবে।


