১৯৮০ সালের কথা। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগৎ তখন প্রাপ্তবয়স্কদের নাটকীয়তায় মগ্ন। সেই ভিড়ের মধ্যে একজন মানুষ ভাবলেন ভিন্ন কথা — শিশুরাও কি পর্দায় নিজেদের খুঁজে পাওয়ার অধিকার রাখে না? সেই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নিল ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’। পরিচালক বাদল রহমান হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের শিশু চলচ্চিত্রের প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা।
জার্মান লেখক এরিখ কাস্টনারের বিখ্যাত উপন্যাস ‘এমিল আন্ড দি ডিটেকটিভ’ — ১৯২৯ সালে প্রকাশিত, পৃথিবীজুড়ে শিশুদের মনে জায়গা করে নেওয়া এক অ্যাডভেঞ্চার। সেই গল্পকে বাংলায় রূপান্তর করলেন বাদল রহমান। নির্মাণ করলেন ছোটদের জন্য পূর্ণ দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র — এই সাহসী উদ্যোগ তখনকার বাংলাদেশে ছিল প্রায় অকল্পনীয়।
১৯৪৯ সালের ৪ জুন জন্মগ্রহণ করা এই মানুষটির জীবন শুধু পর্দায় সীমাবদ্ধ ছিল না। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তিনি অস্ত্র হাতে লড়েছেন। স্বাধীন দেশে ফিরে সেই একই দেশপ্রেম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন সংস্কৃতির লড়াইয়ে। একজন মুক্তিযোদ্ধার কাছে স্বাধীনতার মানে শুধু পতাকা নয় — মানুষের মনকেও মুক্ত করতে হয়। বাদল রহমান বেছে নিলেন চলচ্চিত্রকে সেই মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে।
চলচ্চিত্র পরিচালনার পাশাপাশি তিনি ছিলেন চলচ্চিত্র আন্দোলনের একজন নিষ্ঠাবান কর্মী। লেখালেখিতেও ছিল তার সক্রিয় উপস্থিতি। সংস্কৃতি-ভাবনায় তিনি বিশ্বাস করতেন — শিল্প শুধু বিনোদন নয়, এটি একটি সমাজের আত্মার ভাষা।
‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’ নির্মাণে বাদল রহমান যে ঝুঁকি নিয়েছিলেন, তা সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে বিশাল। শিশুদের নিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি মানেই বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা। কিন্তু তিনি থামেননি। কারণ তিনি জানতেন, একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে তার শিশুদের স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে। সেই স্বপ্নকে পর্দায় ধরে রাখতে পারলেই একটি প্রজন্মকে দেওয়া যায় অমূল্য উপহার।
ছবিটি শুধু বিনোদন ছিল না। ছিল একটি ঘোষণা — বাংলাদেশের শিশুরাও সিনেমার নায়ক হতে পারে, তাদের গল্পও বলার যোগ্য।
২০১০ সালের ১১ জুন বাদল রহমান পৃথিবী ছেড়ে গেছেন। কিন্তু ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’-র পর্দায় যে শিশুরা ছুটোছুটি করেছে, সেই দৌড় থামেনি। বাংলাদেশের শিশু চলচ্চিত্রের ইতিহাস যতদিন লেখা হবে, ততদিন সেই ইতিহাসের প্রথম পাতায় থাকবে একটি নাম — বাদল রহমান।


