জেলায় জেলায় আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে দেশের সব সংসদ সদস্যকে এক সুতোয় গাঁথার লক্ষ্যে একটি নির্দেশনা জারি করেছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে সেই নির্দেশনাকে কেন্দ্র করেই এখন বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে।
সব সংসদ সদস্যকে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির উপদেষ্টা রেখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত প্রজ্ঞাপন মানছেন না জেলা প্রশাসকদের অনেকেই। এমনকি তারা বিরোধীদল জামায়াত ও এনসিপির এমপিদের মিটিংয়ের বিষয়ে অবহিতও করেন না।
ফলে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মিটিংয়ে বিরোধী দলের বেশিরভাগ সংসদ সদস্য যোগ দিতে পারছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।
কয়েকটি জেলার বেশ কয়েকজন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানিয়েছেন, মূলত জনগণের কাছ থেকে তাদের দূরে সরানোর বিশেষ বার্তা দিতেই এমন উদ্যোগ নিচ্ছে জেলা প্রসাশকরা।
চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা-২ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা জেলা প্রশাসককে সভাপতি এবং অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে সদস্য সচিব করে ৩১ সদস্য বিশিষ্ট ‘জেলা আইনশৃ্ঙ্খলা কমিটি’ পুনর্গঠন করা হয়েছিল।
ওই প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ‘জেলার সব সংসদ সদস্য জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করবেন। সভার কার্যবিবরণী তাদের নিয়মিত সরবরাহ করতে হবে। আলাদা নোটিশের মাধ্যমে তাদেরকে সভায় উপস্থিত হওয়ার জন্যে অনুরোধ করতে হবে।’
অথচ প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার প্রায় তিনমাস পেরিয়ে গেলেও বিরোধীদলের অনেক সংসদ সংসদ্য কোন মিটিংয়ে অংশ নিতে পারেননি।
অবশ্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক অনুবিভাগ) জিয়াউদ্দিন আহমেদ টাইমসকে বলেছেন, কোন জেলা প্রশাসক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন মানছেন না অর্থাৎ বিরোধী দলের এমপিদের মিটিংয়ের বিষয়ে জানাচ্ছেন না, এটি তার জানা নেই। এমনটি হওয়ার কথা নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান টাইমসকে বলেন, ‘সরকারি কর্মচারীর জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সুচিন্তিত সরকারি প্রজ্ঞাপন অমান্য করা আচরণবিধির অমার্জনীয় লঙ্ঘন।’
‘এই লঙ্ঘন যদি দলীয় বিবেচনায় হয় তবে তা আচরণবিধির পাশাপাশি নৈতিকতার মানদণ্ডেও অগ্রহণযোগ্য অপরাধ’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যেহেতু সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মচারীরা জেনে বুঝে এ ধরনের আচরণ করছেন, তারা সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার পরিপন্থী ভূমিকায় লিপ্ত হয়েছেন। তাদেরকে জবাবদিহির আওতায় আনতে ব্যর্থ হলে এর দায় সরকারের ওপরই পড়বে।’
ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন টাইমসকে বলন, ‘ডিসিরা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন মানেন না। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী আমরা জেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির উপদেষ্টা । কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন মিটিংয়ে আমি ডাক পাইনি। সিটি করপোরেশনের ভেতরে সরকারের ওই প্রজ্ঞাপন কার্যকর নয় বলেও জানিয়েছিলেন ঢাকা জেলার প্রসাশক।’
তিনি বলেন, ‘জনগণের ভোটে একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্যের সঙ্গে এমন আচরণ মেনে নেওয়া যায় না। এটি সরকারের হীনমন্যতার পরিচয় বহন করে।’ কখনো সরকারি দলের স্থানীয় নেতাদের বিশেষ চাপে আবার কখনো তাদেরকে সন্তুষ্ট করতে অনেক ডিসি এমন আচরণ করছেন বলেও অভিযোগ তার।
কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি আমির হামজারও একই ধরণের অভিযোগ রয়েছে।
যশোর জেলার ছয় আসনের মধ্যে পাঁচ আসনেই বিরোধীদল জামায়াতের এমপি রয়েছেন। এখনো জেলা আইন শৃঙ্খলার কোন মিটিংয়ে তাদের একজনকেও ডাকা হয়নি।
যশোর-১ (শার্শা) আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য আজীজুর রহমান বলেন, ‘জনগণের ভোটে নির্বাচিত এমপিদেরকে জেলার মিটিংয়ে না ডাকার মাধ্যমে জনগণকে অসম্মান করা হচ্ছে। এটি কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মিটিংয়ে অংশ নিতে পারেননি ঢাকা-১৪ আসনের জামায়াতের আরেক এমপি মীর আহমদ বিন কাশেম আরমান।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘শুধু জেলা কমিটির মিটিংয়ে আমাদেরকে সম্পৃক্ত করা হয়নি বিষয়টি তা নয়। সরকারের দেওয়া অনেক সুযোগ সুবিধা থেকেও বিরোধীদলের এমপিদের বঞ্চিত করা হচ্ছে।’
উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘এবারের ঈদে বর্জ্য অপসারণের ব্লিচিং পাউডার ও ব্যাগের একটি বাজেট ছিল। সেগুলো বিতরণে আমাদেরকে সম্পৃক্ত করা হয়নি। আমরা যোগাযোগ করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, বিরোধী দলের এমপিদের মাধ্যমে কোরবানির বর্জ্য অপসারণের পণ্য বিতরণে কোন নির্দেশনা তারা পাননি।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতা ও কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মুজাহিদ বলেন,’মাঝে মধ্যে তারা মিটিংয়ে ডাকেন। কিন্তু কেন যেন আমাদেরকে ডাকার ক্ষেত্রে ডিসির অনাগ্রহ রয়েছে।’
এই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ দলটির সিনিয়র কয়েকজন নেতা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে বিএনপির ফরিদপুর বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও গোপালগঞ্জ-১ (মুকসুদপুর-কাশিয়ানী) আসনের সংসদ সদস্য সেলিমুজ্জামান সেলিম টাইমসকে বলেন, ‘আমার জেলায় জামায়াতের কোনো সংসদ সদস্য নেই। তবে বিভাগে জামায়াতের দুইজন সংসদ সদস্য আছেন, তাদেরকে নিয়মিত জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।’
সেলিম আরও বলেন, ‘যেহেতু সরকারি প্রজ্ঞাপনে সংসদ সদস্যদেরকে কমিটির উপদেষ্টা করা হয়েছে, তাই তারা আমন্ত্রণ পাবেন, এটাই স্বাভাবিক। এর বাইরে অন্য কোনো তথ্য আমার জানা নেই।’
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান টাইমসকে বলেন, ‘এমপিরা জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির উপদেষ্টা। তাদের কিছু বলার বা পরামর্শ থাকলে তারা কমিটিকে বলবেন। মিটিংয়ে তাদেরকে থাকতেই হবে বিষয়টি এমন নয়।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে এমপিদের থাকার বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে জানালে তিনি বলেন, ‘আমরা এমপিদের ডাকি। অনেক সময় ব্যস্ততার কারণে তারা থাকতে পারেন না। এমপিরা বিশেষ করে উপজেলা কমিটির মিটিংয়ে থাকেন এবং জোরালো ভূমিকা রাখেন।’
উত্তরবঙ্গের আরেক জেলা প্রশাসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, তার জেলায় জামায়াতের একাধিক এমপি রয়েছেন। এক মিটিংয়ে তাদেরকে ডাকার পর সরকারি দলের এমপিরা তার উপর ক্ষুব্ধ হওয়ায় তিনি পরের কোনো মিটিংয়ে আর জামায়াতের এমপিদের ডাকেননি।
অবশ্য হাতেগোনা কিছু আসনের বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরা জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মিটিংয়ে ডাক পান বলে জানা গেছে। বিশেষ করে এনসিপি ও জামায়াতের কয়েকজন শীর্ষ নেতার আসনেই কেবল তাদের জেলা প্রসাশকের মিটিংয়ে নিয়মিত উপস্থিত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।


