পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে খলিলুর রহমান: সুচিন্তিত কৌশলী চাল?

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে খলিলুর রহমান: সুচিন্তিত কৌশলী চাল?
পররাষ্ট্রন্ত্রী খলিলুর রহমান | ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের সময় একটি সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তুলে দিয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের হাতে। অনেকের কাছে এটি একটি আকস্মিক চমক মনে হলেও, গভীর পর্যবেক্ষণে একে এক অত্যন্ত সুনিপুণ ভূ-রাজনৈতিক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন উঠেছে, এই নিয়োগের মধ্য দিয়ে ঢাকা কি ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার জটিল ত্রিভুজ সম্পর্কের সমীকরণে কোনো বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে?

ঢাকার রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ছিল শীতল। যদিও আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের কোনো বিচ্ছেদ ঘটেনি, তবে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক উষ্ণতা আগের চেয়ে অনেকটা কমে গিয়েছিল। একটি নবনির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের জন্য প্রতিবেশী বড় রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা যেমন কৌশলগতভাবে জরুরি, তেমনি স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রে ভারত আজও বাংলাদেশের প্রধান অংশীদার।

অনেকেই ধারণা করেছিলেন, নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলাতে হয়তো দলের কোনো জ্যেষ্ঠ বা ঝানু রাজনীতিবিদকে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু তার বদলে দায়িত্ব পেলেন খলিলুর রহমান-যিনি কোনো বড় রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং তার কৌশলগত দক্ষতার জন্য পরিচিত। এই সিদ্ধান্তটি স্পষ্ট করে দেয় যে, বর্তমান সরকার দলীয় জ্যেষ্ঠতার চেয়ে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং অভিজ্ঞতাকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।

খলিলুর রহমান দীর্ঘ সময় যুক্তরাষ্ট্রে কাটিয়েছেন এবং ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারক মহলে তার শক্ত অবস্থান রয়েছে বলে কথা প্রচলিত আছে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা বিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি মার্কিন ও ভারতীয় কর্মকর্তাদের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। অতীতে তার নাগরিকত্ব নিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরেই বিতর্ক উঠেছিল, যা তিনি বরাবরই নাকচ করেছেন। তবে তার সমর্থকরা মনে করেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে যখন কূটনীতি কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ নয় বরং বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও অভিবাসনের সঙ্গে যুক্ত, তখন খলিলুর রহমানের মতো আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বই দেশের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ।

আরও পড়ুন

ওয়াশিংটনের কাছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশ এক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কেন্দ্র। আবার ভারতের কাছেও আঞ্চলিক সংযোগ ও সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য ঢাকা অপরিহার্য। খলিলুর রহমান এমন একজন ব্যক্তি, যিনি এই দুই পরাশক্তির স্বার্থের কেন্দ্রবিন্দুতে ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম। তবে বাংলাদেশের কূটনীতিকে কেবল ওয়াশিংটন বা দিল্লির চোখে বিচার করলে তা অপূর্ণ থেকে যাবে।

চীন আজও বাংলাদেশের অবকাঠামো ও উন্নয়নের প্রধান অংশীদার। বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে শুরু করে শিল্পাঞ্চল—সবখানেই বেইজিংয়ের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। বিশেষ করে মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই বিএনপির সঙ্গে চীনের একটি ঐতিহাসিক সুসম্পর্ক বজায় রয়েছে।

তাই যে কারও জন্যই এই মন্ত্রণালয়ের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে কোনো একদিকে হেলে না পড়ে ভারসাম্য বজায় রাখা। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত যখন চীনের প্রভাব কমাতে একজোট হচ্ছে, তখন বাংলাদেশকে তার চিরাচরিত ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতিতে অটল থাকতে হবে। খলিলুর রহমানকে একদিকে যেমন ওয়াশিংটন ও দিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে হবে, তেমনি নিশ্চিত করতে হবে যেন বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি না ঘটে। বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের যখন বিপুল বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাজার প্রয়োজন, তখন এই ভারসাম্য রক্ষা করা ছাড়া গত্যন্তর নেই।

খলিলুর রহমানের এই প্রত্যাবর্তনের পেছনে একটি ঐতিহাসিক সংযোগও রয়েছে। ২০০১ সালে লতিফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিব ছিলেন। সেই নির্বাচনের পর বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছিল। দীর্ঘ বিরতির পর এমন এক টালমাটাল ভূ-রাজনৈতিক সময়ে তার এই প্রত্যাবর্তন এটাই প্রমাণ করে যে, সরকার এখন এমন এক অভিজ্ঞতায় আস্থা রাখছে যা অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির মাঝে সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে।

তবে এই নিয়োগের আসল সার্থকতা কেবল প্রতীকী বার্তায় নয়, বরং আগামী দিনের নীতি নির্ধারণে বোঝা যাবে। বাংলাদেশ কি যুক্তরাষ্ট্রের বলয়ে আরও বেশি ঢুকে পড়বে, নাকি ভারত ও চীনের সঙ্গে সমান দূরত্ব রেখে নিজস্ব স্বার্থ হাসিল করবে? বাণিজ্য আলোচনা, প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নেই মিলবে এর প্রকৃত উত্তর। আপাতত খলিলুর রহমানের এই দায়িত্ব গ্রহণ এটাই প্রমাণ করে, বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতির দাবার চালগুলো বেশ ভালোই বোঝে এবং অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সামনে পা বাড়াতে চায়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad