হাওর ও সমতলের জেলা নেত্রকোনার কৃষকদের কষ্টের সোনালী ফসল এখন বিষাদে পরিণত হয়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাবে পানিতে তলিয়ে গেছে ১১ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ধান। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বাস্তবে ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি।
জেলার ১০টি উপজেলার মধ্যে মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরী, কলমাকান্দা, বারহাট্টা, কেন্দুয়া, আটপাড়া ও সদর উপজেলায় কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অবশ্য কৃষি বিভাগের দাবি, হাওরের ৭১ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে।
জেলার বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি এখনও অব্যাহত রয়েছে। সোমবারও বেড়েছে পূর্বধলার জারিয়া পয়েন্টে কংস নদী এবং খালিয়াজুরিতে ধনু নদের পানি। তবে সোমেশ্বরী, ধলেশ্বরী ও মগড়া নদীর পানি বর্তমানে স্থিতিশীল থাকায় কৃষকদের মনে সামান্য স্বস্তি ফিরলেও ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি।
নদীর পানি এখনও বিপদসীমার কাছাকাছি থাকায় মাঠের পর মাঠ কাঁচা ও আধাপাকা ধান পচে নষ্ট হচ্ছে। চোখের সামনে ফসলের এই দশা দেখে হাজার হাজার প্রান্তিক কৃষক এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
কৃষকদের এই সংকটের পেছনে চড়া সুদে নেওয়া ঋণ, তীব্র শ্রমিক সংকট এবং সংরক্ষণের অভাব প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক কৃষক অনেক কষ্টে ধান কেটে বাড়িতে আনলেও তা শুকানোর জায়গা পাচ্ছেন না। সংরক্ষণের অভাবে ধান স্তূপাকারে পচে গিয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কেউ কেউ বাড়ির উঠানে বা রাস্তার পাশে সামান্য রোদে ধান শুকানোর চেষ্টা করছেন।
শ্রমিকের মজুরি সাধারণ কৃষকের সাধ্যের বাইরে চলে যাওয়ায় এবং আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির অভাবে ধান মাড়াই করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অনেক ধান মাঠেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
জেলার মেদনী ইউনিয়নের বাসিন্দা কৃষক সবুজ মিয়া বলেন, তিনি ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ মণ ধান ঘরে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু শ্রমিক সংকটের কারণে ধান কাটতে না পারায় বেশিরভাগ ফসল চোখের সামনে পচে যাচ্ছে। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা তিনি কখনও কল্পনা করেননি। তার মতো আরও অনেক কৃষক ধার-দেনা করে আবাদ করে এখন ঋণের চাপে পিষ্ট হচ্ছেন।
এই অবস্থায় রোদ ওঠার সুযোগ কাজে লাগিয়ে কৃষকরা দিনরাত ধান শুকানোর কাজ করছেন। তবে আবারও বৃষ্টি হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি সরকারি হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা। তারা ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, সহজ শর্তে ঋণ এবং ঋণের কিস্তি স্থগিত করার অনুরোধ করেন। একই সঙ্গে দ্রুত ধান কাটার আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহের ওপর জোর দেন কৃষকরা।
নেত্রকোনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আমিনূল ইসলাম জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে নতুন করে বৃষ্টি শুরু হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৃষি বিভাগ সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে তিনি জানান।
এদিকে নেত্রকোনার আটপাড়ার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছেন সংসদ সদস্য ড. রফিকুল ইসলাম হিলালী। তিনি উপজেলার বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত হাওর অঞ্চল পরিদর্শন করে পানিতে তলিয়ে যাওয়া জমির ফসল দেখে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারিভাবে প্রণোদনা দেওয়ার আশ্বাস দেন।


