মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) জন্য ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) ৮০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রস্তাব প্রথমে নাকচ করার পর বিদেশি ঋণ গ্রহণের নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
একটি করপোরেট ঋণ প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ কাঠামোয় নীতিগত পরিবর্তনের দিকে গড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছে, রপ্তানি আয়ের ভিত্তিতে বিদেশি ঋণ গ্রহণের সুযোগ দিয়ে নতুন একটি সার্কুলারের খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের অনুমোদন পেলে সার্কুলারটি শিগগিরই জারি হতে পারে।
প্রস্তাবিত নীতিমালার আওতায় নির্ধারিত সীমার মধ্যে রপ্তানি আয় বিবেচনায় নিয়ে বিদেশি ঋণদাতা সংস্থাগুলো বাংলাদেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিতে পারবে। এতে বিদ্যমান অনুমোদন প্রক্রিয়ার বাধ্যবাধকতা শিথিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
চারটি সমুদ্রগামী জাহাজ কেনার জন্য সম্প্রতি আইএফসি থেকে ৮০ মিলিয়ন ডলার বা ৯৮৪ কোটি টাকা ঋণের প্রাথমিক ব্যবস্থা করে এমজিআই। এ ঋণের অনাপত্তিপত্রের জন্য মেঘনা গ্রুপের পক্ষে আবেদন করে মধুমতি ব্যাংক। তবে প্রথম দফায় আবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা তখন যুক্তি দেন, মেঘনা গ্রুপ মূলত আমদানিনির্ভর ব্যবসা পরিচালনা করে। ফলে ডলারভিত্তিক এত বড় ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পর্যাপ্ত নিশ্চয়তা নেই। ভবিষ্যতে বিনিময় হার অস্থিতিশীল হলে ঋণের দায় আরও বেড়ে যেতে পারে।
মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল মধুমতি ব্যাংকের পরিচালক।
প্রথম আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর গত ৪ জুন নতুন করে আবেদন জমা দেয় মধুমতি ব্যাংক। আবেদনটি পুনর্বিবেচনার মধ্যেই বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণ গ্রহণের জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাইমসকে বলেন, আবেদনটি বাতিল করার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে চাপ তৈরি হয়েছিল।
এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রস্তাবটি বাতিল করায় আমরা কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছিলাম। গভর্নর বলেছেন, আইএফসির অর্থায়ন দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আইএফসির সঙ্গে আরও বেশ কয়েকটি প্রকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে।’
ঋণের বিষয়ে মধুমতি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সফিউল আজম টাইমসকে বলেন, ‘এই লেনদেনে আমাদের ভূমিকা মূলত মধ্যস্থতাকারীর, পোস্ট অফিসের মতো। ঋণ নেবে মেঘনা গ্রুপ, আর ঋণ দেবে আইএফসি।’
তিনি বলেন, ‘ঋণের সব দায় মেঘনা গ্রুপ বহন করবে। ঋণের অর্থে কেনা চারটি জাহাজ আইএফসির কাছে মর্টগেজ থাকবে। এসব জাহাজ আন্তর্জাতিক রুটে পরিচালিত হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় করবে। ফলে ঋণ পরিশোধে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘জাহাজগুলো কেনা হলে একদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে মেঘনা গ্রুপের নিজস্ব পণ্য পরিবহন ব্যয়ও কমবে।’
বিদেশি ঋণ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্ক অবস্থানের মূল কারণ বৈদেশিক মুদ্রা ঝুঁকি। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এর আগে বলেছিলেন, বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয় বৈদেশিক মুদ্রায়। কোনো ঋণগ্রহীতা দায় পরিশোধে ব্যর্থ হলে শেষ পর্যন্ত এর চাপ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও রাষ্ট্রের ওপর পড়তে পারে।
মেঘনার ঋণ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পেছনেও একই যুক্তি কাজ করেছে। তবে সর্বশেষ উদ্যোগ ইঙ্গিত দিচ্ছে, রপ্তানি আয়ের সক্ষমতাকে ভিত্তি করে বিদেশি ঋণ অনুমোদনের একটি নিয়মভিত্তিক কাঠামো গড়ে তুলতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এই ঘটনাটি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) আওতাধীন প্রতিষ্ঠানের জন্য বিদ্যমান ভিন্নধর্মী নিয়ন্ত্রক কাঠামোকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
বিডার আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে ফরেন লোনস অ্যান্ড সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট স্ক্রুটিনি কমিটির মাধ্যমে প্রাথমিক অনুমোদন পায়। অন্যদিকে, বেজার আওতাধীন প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তিপত্র নিতে হয়। মেঘনা গ্রুপের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি বেজার আওতাভুক্ত।
আইএফসি ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কাছ থেকে একাধিক বড় অর্থায়ন পেয়েছে মেঘনা গ্রুপ।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের প্রথম জলবায়ু-স্মার্ট স্টিল কারখানা স্থাপনের জন্য মেঘনা রি-রোলিং অ্যান্ড স্টিল মিলসকে ১০০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়নের ঘোষণা দেয় আইএফসি। প্রকল্পটি বছরে ১৫ লাখ টন ইস্পাত উৎপাদন এবং ২০ হাজারের বেশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।
এর আগে ২০২৩ সালে আইএফসি তাদের গ্লোবাল ফুড সিকিউরিটি প্ল্যাটফর্মের আওতায় মেঘনা গ্রুপের তানভীর ফুড লিমিটেডকে বগুড়ায় আধুনিক চালকল স্থাপনের জন্য ৩৫ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থায়নের ঘোষণা দেয়।
এ ছাড়া তানভীর ডাল মিল অ্যান্ড ফ্লাওয়ার মিলসের জ্বালানি-সাশ্রয়ী আটা মিল প্রকল্পের জন্য ২০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদন করে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক।


