পাবনা মানসিক হাসপাতালে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত দুই রোগীর মারামারিতে একজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্য রোগী। নিহতের নাম ইনজামুল হক, আহত রোগীর নাম নাজমুল ইসলাম। উভয় রোগী হাসপাতালের অতি ঝুঁকিপূর্ণ ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলেন।
ঘটনাটি ঘটেছে ৩ জুন ভোররাতের দিকে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তা জানাজানি হয়। পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে হাসপাতালের পরিচালক শাফকাত ওয়াহিদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। এমন ঘটনায় হাসপাতালের দায়িত্বশীলতা ও রোগীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগী রোগীর পরিবার।
পরিবার ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২ জুন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার খোঁজাখালি গ্রামের আব্দুল মালেকের ছেলে নাজমুল ইসলাম (২৮) ও ঝিনাইদহের রাজনগর গ্রামের মৃত গোলাম নবীর ছেলে ইনজামুল হক (২৬) কে ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। রাত তিনটার দিকে দু’জন মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে মাথায় আঘাত পেয়ে ইনজামুল মারা যান, নাজমুল গুরুতর আহত হন।
মৃত ইনজামুলের ভাই ইজাজুল হক ৩ জুন পাবনা সদর থানায় নাজমুলকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করেছেন।
নাজমুলের স্ত্রী বিলকিস খাতুন বলেন, ‘দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে আমার স্বামী অসুস্থ। সম্প্রতি তার আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে গেছে। সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়েই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছিলাম। এখন সে খুনের আসামি হয়ে গেছে। ভর্তি করার সময় জানানো হয়েছিল তিনি মাঝে মাঝে উত্তেজিত হয়ে মারধর করতে পারেন। তারা যদি সামলাতে না পারত, সরাসরি আমাদের বললে আমরা অন্য ব্যবস্থা নিতাম।’
নাজমুলের বাবা আব্দুল মালেক বলেন, ‘ওরা আমার ছেলেকে মারধর করে হাত-পা ভেঙে দিয়েছে। হাসপাতাল থেকে ফোন করে বলা হলো, আপনার ছেলে অসুস্থ, এসে নিয়ে যান। তারপর ঢাকার মানসিক হাসপাতালে রেফার করার কাগজপত্র ও ওষুধের স্লিপ তৈরি করে ছেলেকে ছাড়পত্র দিয়ে দিল। গাড়িতে ওঠার সময় তারা কাগজপত্র ফেরত নিয়ে জোরপূর্বক ছেলেকে আবার ভেতরে নিয়ে গেছে। এখনো সেখানে আটকে আছে।’
ইজাজুল হক অভিযোগ করেন, ‘যে ছেলে আমার ভাইয়ের সঙ্গে মারামারি করেছে, সে নিজেও মানসিক রোগী। এমন দু’জনকে একসঙ্গে রাখার দায়ভার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে।’
হাসপাতালের নার্সিং সুপারিনটেনডেন্ট রেখা আক্তার বলেন, ‘অনেক সময় রোগীদের স্বাভাবিক মনে হলেও হঠাৎ চরম সহিংস আচরণ শুরু করতে পারে। একজন-দুজন নার্সের পক্ষে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। পুরুষ সেবাকর্মীর তীব্র সংকট ও প্রশিক্ষণের অভাবে প্রত্যাশিত সেবা দেওয়া কঠিন।’
হাসপাতালের পরিচালক শাফকাত ওয়াহিদ বলেন, ‘যারা মারামারি করেছে তারা আগেও হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। গভীর রাতে ঘটনা ঘটায় কেউ বুঝতে পারেনি। মৃত্যুর ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক। অতি ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের জন্য পৃথক আইসোলেশন নেই। সীমিত জনবল নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।’
পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ এস এম মনিরুজ্জামান জানান, ‘অভিযুক্তও মানসিক রোগী। মামলার পর আমরা আদালত ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে পত্র দিয়েছি। নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রেজিনূর রহমান বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদন্ত চলছে। আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি রোগীর মানসিক অসুস্থতা ও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা যাচাই করে দ্রুত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।’


