সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া আইডি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহার রোধে সরকার ‘সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬’ নামে নতুন একটি আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে।
এই আইনের মাধ্যমে ফেসবুক-মেটার মতো আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ক্ষতিকর কন্টেন্ট সরাতে বাধ্য করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
একইসঙ্গে দেশে জুয়া প্রতিরোধে ১৮৬৭ সালের পুরোনো আইনের বদলে নতুন আইন প্রণয়ন এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের আইনি ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খানের এক নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা জানান। এ সময় সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া আইডি, বট-নিয়ন্ত্রিত অ্যাকাউন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ছবি ও ভিডিওর অপব্যবহার রুখতে সরকারের হস্তক্ষেপ’ চেয়ে ৭১ বিধিতে নোটিশটি উত্থাপন করেন সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খান।
নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সবাই লক্ষ্য করছি, সরকারপ্রধান, গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অথবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিবেচনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষতিকর কন্টেন্ট প্রকাশিত হচ্ছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে এটি আসলে স্বাধীনতা কি না, তা পুনরায় সংজ্ঞায়িত করা দরকার।’
তিনি জানান, আইনি ভাষায় যাকে সাইবার স্পেস বলা হয়, তার সব বিষয়কে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে আইনি সংস্কারের ড্রাফটে (খসড়া) হাত দেওয়া হয়েছে।
খসড়া আইনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, সাইবার স্পেসে গুজব, অপতত্ত্বের বিস্তার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর, অপমানকর ও মানহানিকর কন্টেন্ট তৈরি এবং প্রচারের প্রবণতা রোধে একটি সংশোধনী আনতে হবে। ‘আমরা একে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬’ নামে অভিহিত করব। সেখানে গুজব, অপতত্ত্ব ও মানহানি নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা হবে এবং নতুন ধারার শাস্তির বিধান আনা হবে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খান একটি সম্পূরক প্রশ্নে জানতে চান–ফেসবুক বা মেটা কর্তৃপক্ষের কাছে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী কোনো কন্টেন্ট সরাতে বললে তারা অনেক সময় সাড়া দেয় না; এ বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ কী?
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পার্শ্ববর্তী দেশের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘তারা আইনি সুরক্ষার মাধ্যমে এমন বিধান করেছে যে, মেটা কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু আমাদের বিটিআরসি বা সংশ্লিষ্ট সাইবার আইনে সেই বিধানটা নেই। আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে আমরা আরও সমন্বয় করব। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কন্টেন্ট অপসারণের বিষয়টি আমরা আইনে রাখবো, তখন মেটা বা এক্স (সাবেক টুইটার) তা মানতে বাধ্য হবে।’
সাইবার আইনের পাশাপাশি অন্যান্য সামাজিক অপরাধ দমনেও নতুন আইনের কথা জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা ১৮৬৭ সালের ব্রিটিশ আমলের জুয়া প্রতিরোধ আইন দিয়ে চলছি। আশা করছি সংসদের এই সেশনেই নতুন জুয়া প্রতিরোধ আইন আনতে পারব। এর মাধ্যমে অনলাইন ও অফলাইন জুয়া, বেটিং এবং এর সঙ্গে জড়িত মাদকের অপরাধ দমন করা যাবে।’
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ড্রাফটও হয়ে গেছে। যারা মাদক ধরতে যায়, তাদের কোনো অস্ত্র নেই। অথচ মাদক কারবারিরা অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত থাকে। অধিদপ্তরের কাছে ল্যাবরেটরি বা ডগ স্কোয়াডেরও সুবিধা নেই। নতুন আইনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সংস্থা করতে অস্ত্র ও ডগ স্কোয়াডের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
জনপ্রত্যাশা পূরণে সরকারকে আরেকটু সময় দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের কেবল ৩ মাস গেল, আপনারা আরেকটু সময় দিন। দেখবেন আইনগতভাবে কাঠামো শক্তিশালী করে আমরা সব অনাচার ও অপরাধ প্রতিরোধ করতে সক্ষম হব।’


