দীর্ঘ সময় ধরে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের অপেক্ষায় আছে বাংলাদেশ। তবে নির্বাচনের তারিখ যত এগিয়ে আসছে, বাস্তবতা একটি হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরছে। রাজনীতিতে নারীদের দীর্ঘকাল ধরে দ্বিতীয় সারির ভাবা হয়েছে। আসন্ন সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া নারী প্রার্থীদের কাঠামোগত, পদ্ধতিগত এবং রাজনৈতিক বাধার মুখোমুখি হওয়ার চিত্র আবারও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
গভীর সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, ধর্মীয় রক্ষণশীলতা এবং রাজনীতিকে পুরুষশাসিত ক্ষেত্র হিসেবে দেখার মানসিকতা এই বাধাগুলোকে আরও জটিল করে তোলে। এই বিষয়গুলো নারীদের নির্বাচনে অংশ নিতে নিরুৎসাহিত করে। লিঙ্গ সমতা নিয়ে কয়েক দশকের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও নির্বাচনী নীতিমালাগুলো এখনো পুরুষ আধিপত্য দিয়েই নির্ধারিত হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ১০৮ জন নারী প্রার্থী মনোনয়ন পত্র জমা দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে শেষ পর্যন্ত মাত্র ৭০ জনকে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ ৩৮ জন নারী যাচাই-বাছাইয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে বাদ পড়েছেন। প্রাথমিকভাবে যাচাইয়ের পর ৬৩ জন নারীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা হয়েছিল। পরে আপিলের মাধ্যমে আরও ৭ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধতা পায়। ফলে চূড়ান্ত নারী প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৭০ জনে। এর মানে হলো প্রায় ৬৪.৮ শতাংশ নারী আবেদনকারী টিকেছেন এবং ৩৫.২ শতাংশের আবেদন বাতিল হয়েছে।
এর বিপরীতে সামগ্রিক প্রার্থীর চিত্রটি আরও বড়। সারাদেশে মোট দুই হাজার ৫৬৮ জন প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন, যাদের মধ্যে এক হাজার ৮৪২ জনকে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে মোট প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থীর হার মাত্র ৪.২৬ শতাংশ। অথচ তারা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক এবং ভোটার সংখ্যা প্রায় ছয় কোটি ৩০ লাখ। এই স্বল্প হার রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের লিঙ্গ বৈষম্যকেই প্রমাণ করে। এটি এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে প্রতিফলিত করে যেখানে নেতৃত্বকে পুরুষের অধিকার মনে করা হয়। নারীদের কেবল মিছিল-মিটিংয়ে স্বাগত জানানো হয়, কিন্তু ক্ষমতার আসনে তাদের গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
নারী প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিলের পেছনে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বেশ কিছু কারিগরি ও আইনি কারণ উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে দলের ভুল বা অসম্পূর্ণ প্রত্যয়নপত্র, হলফনামায় স্বাক্ষর না থাকা বা হলফনামা জমা না দেওয়া, ঋণখেলাপি হওয়া, ফৌজদারি মামলার তথ্য না দেওয়া এবং প্রার্থীর নিজস্ব স্বাক্ষর না থাকা। এছাড়া নির্বাচনী এলাকার অন্তত এক শতাংশ ভোটারের সমর্থনের তালিকায় ভুল থাকাও একটি কারণ।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি ব্যাখ্যা করে বলেন, এই অযোগ্যতাগুলো কঠোর আইনি শর্ত থেকে তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, প্রার্থীদের অবশ্যই আইন মেনে চলতে হবে। নথিপত্র বা শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হলে নারীদের জন্য আইনে বিশেষ কোনো ছাড় নেই। তবে জেসমিন টুলি আরও বলেন, আইনি বাধ্যবাধকতা সমস্যার একটি অংশ মাত্র। আইনের বাইরে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে সমর্থনের অভাব রয়েছে। এই অভাবের কারণে নারীদের জন্য শুরুতেই শর্তগুলো পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
দলভিত্তিক বিশ্লেষণ করলে সাফল্যের হারে বড় পার্থক্য দেখা যায়। স্বতন্ত্র নারী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি—৪২ জন। কিন্তু তাদের মনোনয়ন বাতিলের হারও ছিল সবচেয়ে বেশি। মাত্র ১৩ জন স্বতন্ত্র নারী প্রার্থী শেষ পর্যন্ত টিকেছেন এবং ২৯ জন বাদ পড়েছেন। অর্থাৎ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই বাতিল হয়েছেন। স্বতন্ত্র নারী প্রার্থীদের হয়রানি ও ভয়ভীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো কোনো দলীয় সুরক্ষা থাকে না। রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি এবং নারীদের রাজনৈতিক প্রচারণার প্রতি ধর্মীয় আপত্তির কারণে অনেকের জন্য ভোটারদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এটি প্রমাণ করে যে, দলীয় সমর্থন ছাড়া নির্বাচনে লড়া নারীদের জন্য অনেক বেশি ঝুঁকির।
নারী প্রার্থীরা বিভিন্ন স্তরে হয়রানির শিকার হন। মাঠপর্যায়ের প্রচারণার সময় অনেকেই গালিগালাজ, চরিত্রহনন এবং ভয়ভীতির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর মন্তব্য, হুমকি, ভুয়া অভিযোগ এবং পরিকল্পিত ট্রলিং মারাত্মক মানসিক চাপ তৈরি করে। এসব কারণে নারীরা রাজনীতিতে থাকতে নিরুৎসাহিত হন। এর বিপরীতে দল মনোনীত নারীরা কিছুটা ভালো অবস্থানে ছিলেন, কিন্তু তাদের সংখ্যা খুবই কম। বিএনপি মাত্র ১০ জন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে, যাদের মধ্যে ৯ জন বৈধতা পেয়েছেন এবং মাত্র একজন বাদ পড়েছেন।
বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী), ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, গণফোরাম, এনসিপি, জাতীয় পার্টি, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি এবং বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির মতো বেশ কিছু বামপন্থী ও সমাজতান্ত্রিক দলের প্রায় সব নারী প্রার্থী টিকে গেছেন, যদিও সংখ্যায় তারা অনেক কম ছিলেন। তবে কিছু ছোট বা নতুন দল অনেক সমস্যার মুখে পড়েছে। এবি পার্টির ৩ জন নারী প্রার্থীর মধ্যে ২ জন বাতিল হয়েছেন। বাংলাদেশ লেবার পার্টির একমাত্র নারী প্রার্থীও বৈধতা পাননি।
সবচেয়ে স্পষ্টভাবে নারীদের বর্জন দেখা গেছে জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রে। তারা ২৭৬টি আসনে মনোনয়ন জমা দিলেও একজন নারীকেও মনোনয়ন দেয়নি। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, কীভাবে নারীদের নেতৃত্ব থেকে দূরে রাখতে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়।
জেসমিন টুলি বলেন, এই সংখ্যাগুলোই বৈষম্য প্রকাশ করে। অধিকাংশ দলই তাদের নিজস্ব কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী রাখার লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। নির্বাচনী আইন (আরপিও) অনুযায়ী দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী রাখা বাধ্যতামূলক হলেও কোনো দলই তা পুরোপুরি মেনে চলেনি। নির্বাচন কমিশন এই লক্ষ্য পূরণের সময় ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়িয়েছে। তবে বর্তমান চিত্র বলছে, ৫১টি দলের মধ্যে ৩০টি দল একজন নারী প্রার্থীকেও মনোনয়ন দেয়নি।
১০ এবং ১১ জানুয়ারি আপিলের মাধ্যমে বেশ কয়েকজন নারী তাদের প্রার্থিতা ফিরে পান। তারা হলেন— তাসনিম জারা (স্বতন্ত্র, ঢাকা-৯), কামরুন্নাহার সাথী (বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল, কুমিল্লা-৬), সাবিনা জাবেদ (ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, ঢাকা-১৮), চম্পা রানী সরকার (বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, নেত্রকোনা-৪), কাজী রেহা কবির (কিশোরগঞ্জ-৪), দিলরুবা নূরী (বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল, বগুড়া-৬) এবং শামীমা আরা পারভীন (জাতীয় পার্টি, খুলনা-৫)।
পেশাগত তথ্য বলছে, আইনজীবী, ডাক্তার, শিক্ষক, কৃষক এবং উন্নয়নকর্মীদের প্রায় সবারই মনোনয়নপত্র বৈধ অনুমোদিত হয়েছে। আইনি নথিপত্র বিষয়ে তাদের জানাশোনা বেশি থাকায় এটি সম্ভব হয়েছে। এর বিপরীতে ব্যবসায়ী ও গৃহবধূদের বাতিলের হার ছিল বেশি। সাধারণত সম্পদের হিসাব বা আর্থিক নথিপত্রের সমস্যার কারণে তারা বাদ পড়েছেন। শিক্ষার্থী এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক পেশার প্রার্থীরাও সহজে বাদ পড়েছেন।
সম্পদ সংক্রান্ত তথ্য নারী প্রার্থীদের মধ্যে বিশাল অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকাশ করে। প্রায় ৫৯ শতাংশ নারী প্রার্থীর সম্পদ ৫০ লক্ষ টাকার নিচে। মাত্র ৮ শতাংশের সম্পদ ৫ কোটি টাকার বেশি। ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের তাহমিনা আক্তারের সম্পদ মাত্র ৫০ হাজার টাকা, যেখানে বিএনপির আফরোজা খানম রিতার সম্পদ ২৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
ভৌগোলিক দিক থেকে ঢাকা বিভাগ থেকে সর্বোচ্চ ৪০ জন নারী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে বৈধ হয়েছেন ২৮ জন। সিলেট ও বরিশালে এই সংখ্যা ছিল সর্বনিম্ন। আর্থিক এবং আইনি রেকর্ডে দেখা যায়, ১৪ জন প্রার্থীর ঋণ ছিল এবং ৯ জনের নামে ফৌজদারি মামলা ছিল। এতে তাদের মনোনয়নপত্র বাতিলের হারও ছিল বেশি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে নারীরা বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। আশা করা হয়েছিল রাজনীতিতে এবার নারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে। কিন্তু তার বদলে নারী প্রার্থীর সংখ্যা কমেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ১৩৩ জন নারী লড়লেও এবার সেই সংখ্যা নেমেছে ১০৮-এ। ২০১৮ সালে লড়েছিলেন ৬৮ জন। ২০০৮ সালে এক হাজার ৫৫২ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র ৫৬ জন।
অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, আন্দোলনের সময় নারীরা নেতৃত্ব দেন। কিন্তু পরে তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়। সরাসরি নির্বাচিত হওয়া ছাড়া নারীরা নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারবেন না। জেসমিন টুলি বলেন, নারীরা মাঠপর্যায়ে সক্ষম কর্মী হওয়া সত্ত্বেও দলগুলো তাদের মনোনয়ন দিতে চায় না।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেন, দলের অভ্যন্তরীণ সংস্কার ছাড়া রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ কেবল নামমাত্রই থেকে যাবে।


