নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু থামছে না, বাড়ছে প্রশ্ন

নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু থামছে না, বাড়ছে প্রশ্ন
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

দেশের কারাগারগুলোতে কারাবন্দীদের মৃত্যুর ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। গাদাগাদি সেল, তীব্র চিকিৎসা সংকট, অ্যাম্বুলেন্সের অভাব আর নির্যাতনের নানা অভিযোগ–সব মিলিয়ে কারাবাস এখন বন্দীদের জন্য এক নির্মম বাস্তবতা। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত ১৮৫ জন বন্দীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, যা দেশের কারাগারগুলোর ভেতরের নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে।

একেবারে সাম্প্রতিক ঘটনা হিসেবে, গত বুধবার রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মারা যান মোহাম্মদপুর থানা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান মনির। ২০২৪ সালের ১৮ অক্টোবর গ্রেপ্তারের পর তিনি দুবার জামিন পেলেও কারাগারের ফটক থেকে বারবার নতুন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছিল। এর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে চট্টগ্রাম কারাগারে যুবলীগ নেতা মোহাম্মদ নুরুল আলম এবং ফরিদপুরে ডিবি হেফাজতে ছাত্রলীগ কর্মী ইশতিয়াক আহম্মেদ প্রান্তের মৃত্যু হয়।

কারাগারে বন্দীদের মৃত্যুর ঘটনা নতুন না হলেও সাম্প্রতিক সময়ে অল্প দিনের ব্যবধানে এমন মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে সাধারণ বন্দী থাকলেও স্বাভাবিকভাবে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মৃত্যু নিয়ে আলোচনা বেশি হচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিরাপদ হেফাজতে বন্দিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।

কারা কর্তৃপক্ষ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দাবি, বন্দীরা স্বাভাবিক নিয়মে অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। তবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের দাবি, বন্দীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়, যা প্রতিটি মৃত্যুর পর পরবর্তী তদন্তের নিরপেক্ষতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে এ বছরের জুন পর্যন্ত দেশের কারাগারগুলোতে ১৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১২০ জন বিচারাধীন এবং ৫৬ জন সাজা পাওয়া বন্দী। শুধু ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে মারা গেছেন ৬১ জন, যাদের মধ্যে ৩৭ জন ছিলেন বিচারাধীন।

অন্যদিকে, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) গত মে মাস পর্যন্ত ১৬৩ জনের মৃত্যুর হিসাব দিয়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, মৃতদের মধ্যে ৯১ জন বিচারাধীন ও ৭২ জন দণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন, যাদের মধ্যে অন্তত ১৬ জন নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী।

দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যান দেখিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা অধিকার। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০১ সালের ২২ জুন থেকে ২০২৬ সালের ২২ জুনের মধ্যে দেশে মোট ৪৮৬ জনের হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে। যার মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ১৮৪ জন, পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ৬ জন, সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ৪২ জন, আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে ২১৩ জন এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ২৯ জন মারা গেছেন।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, শারীরিক নির্যাতন, তীব্র মানসিক চাপ এবং সময়মতো চিকিৎসার অভাবই এই মৃত্যুগুলোর প্রধান কারণ।

আরও পড়ুন

সাভার পৌরসভা আওয়ামী লীগের পরিবেশ ও বনবিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মারা যান। স্বজনদের অভিযোগ, তাকে মারাত্মক নির্যাতন করা হয়েছিল এবং হাসপাতালে নেওয়ার আগে তার মৃত্যু হয়।

একই বছরের জুনে কেরানীগঞ্জ কারাগারে মারা যান সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান সুজন। পরিবারের দাবি, কারাগারের অমানবিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তিনি আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন।

এ ছাড়া, চিকিৎসার অভাবে সাভার হকার্স লীগের নেতা আতাউর রহমান আতা এবং কারাগারে অনবরত নির্যাতনের কারণে গত ১৯ মে চট্টগ্রাম কারাগারে দেবশীষ চৌধুরী নামের এক বন্দীর মৃত্যুর অভিযোগ তুলেছে তাদের পরিবার।

অবশ্য কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহার হোসেন টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘হেফাজতে প্রতিটি মৃত্যুর পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত ও ফরেনসিক বিশ্লেষণ করা হয় এবং সেখানে নির্যাতনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’

তবে অধিকারের পরিচালক এএসএম নাসির উদ্দিন এলান বলেন, অনেক বন্দী আগে আহত বা অসুস্থ অবস্থায় কারাগারে ঢোকেন এবং ভেতরে চিকিৎসা পান না। আবার অনেকে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় ঢুকে কারাগারের ভেতরের পরিবেশের কারণে অসুস্থ হয়ে মারা যান।

নাসির উদ্দিন জানান, দেশের কারাগারগুলোতে চিকিৎসকদের তীব্র ঘাটতি পুরো চিকিৎসা সেবাকে অচল করে দিয়েছে। কোনো বন্দী হৃদরোগ বা গুরুতর অসুস্থতায় ভুগলে তাকে হাসপাতালে পাঠানোর প্রশাসনিক প্রক্রিয়াতেই সময় নষ্ট হয়, যা মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

এর ওপর রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। অভিযোগ রয়েছে, যে বন্দীরা ঘুস দিতে পারেন না, তাদের মৌলিক সুযোগ-সুবিধা ও চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা হয়। ফলে দরিদ্র বন্দীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হন।

কারা মহাপরিদর্শক এই সংকট স্বীকার করে জানান, দেশের কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেশি বন্দী রয়েছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, দেশব্যাপী ৭৫টি কারাগারের ১৬১টি চিকিৎসক পদের মধ্যে ১৫৯টি শূন্য। এই সংকট কাটাতে সরাসরি নন-ক্যাডার চিকিৎসক নিয়োগের জন্য প্রেষণ বিধিমালা সংশোধনের প্রস্তাব জমা দিয়েছে কারাদপ্তর।

কারাদপ্তরের নিজস্ব হিসাব বলছে, গত ৫ বছরে কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা গেছেন ৪৯১ জন বন্দী। নির্ধারিত কোনো অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় গুরুতর অসুস্থ বন্দীদের রিকশা, ভ্যান বা যখন যে যানবাহন পাওয়া যায় তা দিয়ে হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে দেশের ৭৫টি কারাগারের জন্য সচল অ্যাম্বুলেন্স আছে মাত্র ২৩টি।

২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে কারাদপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে ১০৭টি অ্যাম্বুলেন্সের আবেদন করা হয়েছিল। সে সময় ৪৬টি অ্যাম্বুলেন্সের বরাদ্দ অনুমোদন করা হলেও গত সাড়ে তিন বছরে একটি গাড়িও কারাগারগুলোতে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad