স্প্যানিশ স্কিলের মহিমায় ধূলিসাৎ বেলজিয়ামের প্রতিরোধ

স্প্যানিশ স্কিলের মহিমায় ধূলিসাৎ বেলজিয়ামের প্রতিরোধ
ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের দ্বিতীয় স্থানে থাকা স্পেনের বিশ্বকাপ যাত্রাটা মোটেও সুখকর ছিল না। আটলান্টিক মহাসাগরের ক্ষুদ্র দ্বীপ দেশ কেপ ভার্দের রক্ষণাত্মক ফুটবলের কাছে শুরুতেই পয়েন্ট খোয়াতে হয়েছিল তাদের। ওই ড্রয়ের পর স্প্যানিশদের সিগনেচার ‘টিকিটাকা’ ফুটবল তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে এবং কোচকে নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে।

তবে শুরুর সেই ধাক্কা কাটিয়ে নিজেদের কৌশল বদলে ঠিকই সেমিফাইনালের টিকিট কেটেছে স্পেন। দ্বিতীয় ম্যাচ থেকে নিজেদের চেনা স্কিল ও চেনা ছন্দে ফেরে লা রোহারা। লস অ্যাঞ্জেলসের কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসে তৃতীয়বারের মতো শেষ চারে জায়গা করে নিল তারা। দলটির এমন পারফরম্যান্সে ফুটবল বিশ্ব যেন ১৬ বছর আগের সেই ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের ইকার ক্যাসিয়াসের চ্যাম্পিয়ন স্পেনকেই খুঁজে পাচ্ছে। দীর্ঘ ১৬ বছর পর আবারও বিশ্বজয়ের গৌরব উদযাপনে স্পেনের সামনে এখন বাধা মাত্র দুটি। যার প্রথমটি হলো আগামী ১৪ জুলাই ডালাসে ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনাল ম্যাচ। ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে ওঠার লক্ষ্য নিয়ে এমবাপ্পে-দেম্বেলেদের মুখোমুখি হবে স্প্যানিশরা।

এই ম্যাচের আগে বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে অতীতের ২২ বারের দেখায় ১২-৫ ব্যবধানে এগিয়ে থাকার মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা ছিল স্পেনের। এমনকি শেষ ১১টি ম্যাচেও তাদের বিপক্ষে অপরাজিত থাকার চমৎকার রেকর্ড উজ্জীবিত করেছিল দলটিকে। এই জয়ের মাধ্যমে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর থেকে ২০২১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইতালির গড়া টানা ৩৭ ম্যাচে অপরাজিত থাকার বিশ্বরেকর্ডকেও ছুঁয়ে ফেলেছে স্পেন।রেকর্ডের এই ম্যাচে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ৪-২-৩-১ ফরমেশনে দল সাজিয়েছিলেন। যেখানে একমাত্র স্ট্রাইকার ওয়ারজাবালের ঠিক পেছনে ছিলেন ইয়ামাল, ওলমো ও বাইনা। আর মাঝমাঠের দায়িত্ব সামলেছেন রদ্রি ও রুইজ। বেলজিয়ামের বিপক্ষে এই চেনা কম্বিনেশনেই অভ্যস্ত ফুটবল খেলেছে স্পেন। দুই প্রান্ত দিয়ে প্রথাগত হাই ক্রস না করে, নিখুঁত থ্রু পাস ও কাটব্যাকের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে ফাটল ধরানোর চমৎকার প্রদর্শনী দেখিয়েছে তারা।

কোচের এই কৌশলে শুক্রবার সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল ছিলেন তরুণ লামিন ইয়ামাল। পুরো ম্যাচে বলের সঙ্গে ৮০ বার সংযোগ ঘটিয়েছেন তিনি, শট নিয়েছেন ৬টি যার মধ্যে ২টি ছিল গোল অভিমুখে। স্পেনের প্রথম গোলটিতেও এই তরুণের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। ম্যাচের ৩০তম মিনিটে ডান প্রান্তে ইয়ামালের সঙ্গে ওয়ান-টু খেলে বেলজিক ডিফেন্ডার ডোকুকে পরাস্ত করেন পোরো এবং বল বাড়িয়ে দেন ওলমোকে। ওলমোর নেওয়া শট বেলজিয়ামের তারকা গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া পাঞ্চ করে পুরোপুরি বিপদমুক্ত করতে ব্যর্থ হন। বলটি দিক পরিবর্তন করে বক্সে থাকা সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার রুইজের পায়ে আসতেই নিখুঁত ফিনিশিংয়ে স্পেনকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন তিনি।

ম্যাচের ৩৫ ও ৪০ মিনিটে মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে আরও দুবার গোল করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন ইয়ামাল। ৩৫ মিনিটে তার নেওয়া দুর্দান্ত ফ্রি-কিকটি কোর্তোয়া ঝাঁপিয়ে পড়ে রক্ষা করেন। এরপর ৪০ মিনিটে রদ্রির দূরপাল্লার পাস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এক দ্রুত গতিতে বক্সে ঢুকে দুজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বাঁ-পায়ে জোরালো শট নেন ইয়ামাল, তবে তা সাইড পোস্ট ঘেঁষে বাইরে চলে যায়।

আরও পড়ুন

ম্যাচের দ্বিতীয় গোলেও নেপথ্য কারিগর ছিলেন ইয়ামাল। খেলার ৮৬তম মিনিটে ওলমোর পরিবর্তে আর্সেনালের মাইকেল মেরিনোকে মাঠে নামান স্প্যানিশ কোচ। সুপার সাব হিসেবে পর্তুগালের বিরুদ্ধে জোড়া গোল করা মেরিনো মাঠে নামার মাত্র ২ মিনিটের মাথায় কোচের আস্থার প্রতিদান দেন। ৮৮তম মিনিটে ইয়ামাল ও উইলিয়ামসের চমৎকার কম্বিনেশন থেকে আসা বল জালে জড়িয়ে স্পেনকে ২-১ গোলের জয় ও সেমিফাইনালের টিকিট এনে দেন তিনি।

স্পেনকে অনুকরণ করে বেলজিয়ামও ৪-২-৩-১ ফরমেশনে মাঠে নেমেছিল, তবে তাদের রণকৌশল ছিল মূলত প্রতি-আক্রমণ (কাউন্টার অ্যাটাক) নির্ভর। এই ফরমেশনে খেলেই তারা স্পেনের রক্ষণহীন থাকার বড় এক গর্বে ধাক্কা দিয়েছিল। গ্রুপ পর্ব ও নকআউটের আগের দুই ম্যাচ মিলিয়ে টানা ৫ ম্যাচে কোনো গোল না খাওয়া স্পেনের জাল অবশেষে কাঁপান বেলজিক ফরোয়ার্ড চার্লস ডি কেটেলার।

বিশ্বকাপে টানা ৬০০ মিনিটেরও বেশি সময় ক্লিনশিট রাখা স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমনের অপরাজেয় যাত্রার অবসান ঘটে ৪১তম মিনিটে। টিমোথি কাস্তানের চমৎকার এক ক্রস থেকে দুর্দান্ত হেডে ম্যাচে ১-১ সমতা আনেন কেটেলার। এরপর বেলজিয়াম গোলরক্ষক কোর্তোয়া আরও ৬টি দুর্দান্ত সেভ করে ম্যাচটিকে অতিরিক্ত সময়ে টেনে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিলেন।

পুরো ম্যাচের পরিসংখ্যানে স্পেনের একচ্ছত্র দাপট স্পষ্ট ছিল। যেখানে স্পেনের পায়ে বলের নিয়ন্ত্রণ ছিল ৬৮%, সেখানে বেলজিয়ামের দখলে ছিল মাত্র ৩২%। স্পেন যেখানে গোল অভিমুখে ৮টি অন-টার্গেট শট নিয়েছে, বেলজিয়াম সেখানে ২টির বেশি নিতে পারেনি। পাসের ক্ষেত্রেও বিশাল ব্যবধান ছিল। স্পেনের ৫৯৮টি পাসের বিপরীতে বেলজিয়াম সম্পন্ন করতে পেরেছে মাত্র ২৪৪টি পাস।

চলতি বিশ্বকাপে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নেমে বেশ কয়েকবার বেলজিয়ামের ত্রাতা হওয়া রোমেলু লুকাকু এই ম্যাচে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। কোয়ার্টার ফাইনালের শেষ ৩০ মিনিটের জন্য মাঠে নেমে তিনি স্পেনের গোলপোস্ট লক্ষ্য করে একটি শটও নিতে পারেননি। পুরো সময়ে মাত্র ৫ বার বল স্পর্শ করতে পেরেছিলেন এই তারকা স্ট্রাইকার।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad