৬১ কোটি টাকার প্রকল্পে বাস্তুচ্যুতদের জন্য ৮ কোটি টাকা বরাদ্দ

৬১ কোটি টাকার প্রকল্পে বাস্তুচ্যুতদের জন্য ৮ কোটি টাকা বরাদ্দ
সমাজসেবা অধিদপ্তরের লোগো।
Advertisement
Advertisement

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষদের সহায়তার উদ্দেশ্যে নেওয়া ৬১ দশমিক ২৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্পে সরাসরি উপকারভোগীদের জন্য মাত্র ৮ দশমিক ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।

তহবিলের বাকি প্রায় ৮৭ শতাংশ অর্থই পরামর্শক, ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয়ের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যয়ের এই চরম ভারসাম্যহীনতার কারণে পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটিকে অনুমোদনের সুপারিশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

জার্মান সাহায্য সংস্থা জিআইজেডের অর্থায়নে এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সমাজসেবা অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পটির লক্ষ্য–৩০০ জন জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত মানুষকে ক্ষুদ্র ব্যবসায় অনুদান দেওয়া এবং আরও ১ হাজার ৫০০ জনের জীবিকার উন্নয়ন করা। খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজশাহী এবং সিরাজগঞ্জে ১ বছর ৯ মাস মেয়াদে পরিচালনার জন্য এটি নকশা করা হয়েছিল।

তবে ৩০০ জন মূল উপকারভোগীর বিপরীতে ২৯ দশমিক ৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৭৩ জন স্থানীয় ও বিদেশি পরামর্শক নিয়োগের প্রস্তাব করায় গত ৫ জুনে অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় এর ব্যয় কাঠামো নিয়ে তীব্র আপত্তি ওঠে।

প্রকল্পের প্রস্তাবিত ডিপিপি অনুযায়ী, মোট বরাদ্দের মধ্যে উপকারভোগীদের সরাসরি অনুদানের জন্য রাখা হয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ১১ কোটি টাকা (১৩ দশমিক ২৩ শতাংশ)। বাকি ৫৩ দশমিক ১৮ কোটি টাকা (৮৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ) ব্যয় হবে পরামর্শক, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, অফিস ভাড়া ও ভ্রমণ খাতে।

এর মধ্যে কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণের জন্য ৩ দশমিক ৫১ কোটি, অভ্যন্তরীণ ভ্রমণের জন্য ১ দশমিক ২৭ কোটি, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা খরচ ১০ দশমিক শূন্য ৭ কোটি এবং অফিস ভাড়ার জন্য ৩ দশমিক ১৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া, তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম ক্রয়ের উচ্চ ব্যয় নিয়েও কমিশন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের প্রধান ও অতিরিক্ত সচিব শাহ মো. হেলাল উদ্দিন টাইমন অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা এটির অনুমোদনের সুপারিশ করিনি। কারণ, উপকারভোগীদের জন্য খুব সামান্য অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। এর বিপরীতে, পরামর্শক এবং অন্যান্য খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উচ্চ ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।’

আরও পড়ুন

কমিশনে প্রস্তাবটি বিবেচনার আগেই প্রকল্পের কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে–এমন তথ্য সামনে আসার পর বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে।

হেলাল উদ্দিন জানান, মূল প্রস্তাবে কার্যক্রম শুরু হওয়ার বিষয়টি গোপন করা হয়েছিল। তবে উদ্যোগটি বিদেশি দাতার অর্থায়নে পরিচালিত হওয়ায় পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশ না থাকলেও জিআইজেড-এর সরাসরি অর্থায়নে চলা কাজগুলো পুরোপুরি বন্ধ নাও হতে পারে।

বাস্তবায়নকারী সংস্থা সমাজসেবা অধিদপ্তর ব্যয়ের এই কাঠামোর দায় এড়াতে গিয়ে জানিয়েছে, দাতা সংস্থার বেঁধে দেওয়া শর্তের আলোকে এই প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছিল।

অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার পরিচালক মো. সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, ‘অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে সম্পাদিত চুক্তির অধীনে দাতা সংস্থার শর্তানুযায়ী প্রকল্প প্রস্তাবটি তৈরি করা হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে দাতা নির্ধারিত কাঠামোর বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকে না।’

সাজ্জাদুল দাবি করেন, এই ব্যয় কাঠামো নিয়ে অধিদপ্তরও আপত্তি তুলেছিল। তাহলে কেন এটি অনুমোদনের জন্য পাঠানো হলো–জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওপর ছেড়ে দেন।

মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন-১ শাখার জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মোহাম্মদ সেলিম হোসেন বলেন, ‘সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পের নিয়মের সঙ্গে বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পের নিয়মের পার্থক্য রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশ ছাড়া সরকারি প্রকল্প শুরু করা না গেলেও বিদেশি দাতা সংস্থাগুলো স্বাধীনভাবে কার্যক্রম শুরু করতে পারে।’

জিআইজেড কাজ শুরু করেছে কি না–তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত না করলেও তিনি বলেন, ‘আপনাদের মতো আমিও জানতে পেরেছি যে তারা তাদের অংশের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।’

সরকারের অনুমোদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জিআইজেড মূলত উদ্যোগটিকে আইনি জটিলতামুক্ত ও আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে চেয়েছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তবে, মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ নাজমুল আহসান এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে প্রশ্নগুলো জিআইজেডের দিকে পাঠিয়ে দেন।

এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) একজন কর্মকর্তা বলেন, জিআইজেড সাধারণত তাদের নিজস্ব নিয়ম অনুসারেই তহবিল ব্যয় করে। কিছু ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি ও বাস্তবায়নের নির্দেশনা থাকলেও তা বাধ্যতামূলক নয়। তবে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোই তৈরি করে থাকে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad