প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি নিজেদের দাবি-দাওয়ার বাইরে এসে দেশের জন্য কী করা যায় তা নিয়ে ভাবার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
স্থানীয় সময় রোববার রাতে মালয়েশিয়ায় হোটেল শাংগ্রি লা হোটেলে প্রবাসী বাংলাদেশীদের এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান। কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে হোটেলে পৌঁছানোর পর এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তার সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে আমাদের কী দাবি আছে, সেটি থেকে বেরিয়ে এসে চিন্তা করতে হবে আমাদের দেশের প্রতি কী কর্তব্য আছে। আমরা দেশের জন্য কী করতে পারি—এটাই হোক আমাদের চিন্তা।’
গত দেড় দশকে ফ্যাসিবাদ শাসনে দেশের অবস্থা তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেখুন দেশ থেকে কেউ একজন, একটি গোষ্ঠী নিতে নিতে দেশটিকে একদম শেষ করে দিয়েছে। দেশটাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। বুকের রক্ত দিয়ে মানুষ দেশকে স্বৈরাচার মুক্ত করেছে। এখন আসুন আমরা সবাই মিলে দেশের জন্য কি করতে পারি, এটিতে আমরা থাকি।’
মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচির কথা তুলে ধরেন। তিনি বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারের বিভিন্ন দিক ব্যাখ্যা করেন এবং বলেন, সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে।
তিনি বিশেষভাবে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল পুনঃখনন, কৃষি উন্নয়ন, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালীকরণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিষয়গুলো তুলে ধরেন। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য জনগণের সহযোগিতা ও সমর্থন কামনা করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আমার চিন্তার কথাগুলো আপনাদের সামনে তুলে ধরেছি। আপনারা যদি বিশ্বাস করেন, এই পরিকল্পনাগুলো দেশের উন্নয়নে সহায়ক হবে, তাহলে আমাদের জন্য দোয়া করবেন যাতে আমরা সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারি।’
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল
দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের সামনে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় সময় অপেক্ষা করছে। তবে সেই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না।
তিনি বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি বাংলাদেশের সামনে একটি সুন্দর ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ অর্জনের জন্য আমাদের পরিশ্রম করতে হবে, কষ্ট করতে হবে এবং সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে ধৈর্য।’
তার মতে, অবকাঠামোগত উন্নয়নই উন্নয়নের একমাত্র সূচক নয়; বরং নাগরিকদের আচরণ, দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক সংস্কৃতিও একটি দেশের অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
কুয়ালালামপুরের পরিচ্ছন্নতার উদাহরণ
মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের পরিচ্ছন্ন পরিবেশের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিমানবন্দর থেকে শহরে আসার পথে পরিচ্ছন্ন রাস্তা ও পরিবেশ তার নজরে এসেছে।
তিনি বলেন, ‘এই পরিচ্ছন্নতার কাজে আমার দেশের ভাইয়েরাই কাজ করছেন। যদি তারা এখানে এই কাজ সফলভাবে করতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশে কেন আমরা পারব না?’
তিনি প্রশ্ন রাখেন, বিদেশে যে শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে বাংলাদেশিরা কাজ করেন, দেশে ফিরে বা দেশের জন্য কাজ করার সময় সেই একই মানসিকতা কেন দেখা যায় না।
‘প্রতিশোধ নয়, এগিয়ে যাওয়ার সময়’
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি ১/১১-পরবর্তী সময় এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অতীতে তার পরিবার নানা ধরনের প্রতিকূলতা ও অবিচারের শিকার হয়েছে।
এ সময় তিনি তার মা খালেদা জিয়া-এর অসুস্থতার সময় অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ার একটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন।
তবে তিনি বলেন, ক্ষমতায় থাকার কারণে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ থাকলেও সেটি দেশের জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না। তিনি বলেন, ‘প্রতিশোধ নিলে কারো কোনো উপকার হবে না। আমাদের এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’
তিনি বলেন, শুধু যদি নিজেরটা আমরা চিন্তা করি কোনটিই হবে না। দেশ আমাদের সবার। আমাদের সবাইকে ধৈর্য ধারণ করে ধীরে ধীরে এগোতে হবে।
দেশের প্রতি প্রবাসীদের কর্তব্য রয়েছে
প্রবাসীদের সঙ্গে আবেগঘন এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনি প্রবাসী, আর আমি দেশি—এই পরিচয়ের বাইরে আমরা সবাই বাংলাদেশের মানুষ।’
তিনি বলেন, দেশের ওপর যেমন প্রবাসীদের অধিকার রয়েছে, তেমনি দেশের প্রতি তাদের কর্তব্যও রয়েছে। একইভাবে দেশে বসবাসকারী মানুষেরও অধিকার ও দায়িত্ব দুটোই আছে।
‘আমরা বারবার দাবি নিয়ে কথা বলি। কিন্তু কেন আমরা কর্তব্য নিয়ে কথা বলি না? আসুন, আমরা ভাবি দেশের জন্য আমরা কী করতে পারি,’—বলেন তিনি।
প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগের আশ্বাস
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত প্রবাসীরা তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা একযোগে তুলে ধরতে গেলে কিছুটা হৈচৈ সৃষ্টি হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং পর্যায়ক্রমে কথা বলার পরামর্শ দেন।
প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা ও দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে আলোচনা করবে। তবে তিনি স্পষ্ট করেন যে, কোনো দেশের আইন অমান্য করে সুবিধা আদায় করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ‘আমাদের মালয়েশিয়ার আইন মেনেই চলতে হবে। তাদের আইনের সীমার মধ্যেই আমরা প্রবাসীদের জন্য যতটুকু সুবিধা আদায় করতে পারি, সেই চেষ্টা অবশ্যই করব।’
তার এই বক্তব্যে উপস্থিত প্রবাসীরা করতালির মাধ্যমে সমর্থন জানান।


