কমিউনিস্ট প্রার্থী জোহরান মামদানি নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচিত হলে নূন্যতম প্রয়োজন ছাড়া শহরের ফেডারেল তহবিল বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, মেয়র নির্বাচনের ভোট গণনার আগের রাতে স্থানীয় সময় সোমবার সামাজিকমাধ্যমে নিউইয়র্কের ভোটারদের উদ্দেশ্যে এ হুমকি দেন তিনি। ট্রাম্প তার পোস্টে লিখেছেন, ‘যদি কমিউনিস্ট প্রার্থী জোহরান মামদানি যদি নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে জয়ী হন, তাহলে আমার প্রিয় ও প্রথম ঘর নিউইয়র্ককে ন্যূনতম প্রয়োজনীয়তা ছাড়া ফেডারেল তহবিল পাঠানো অত্যন্ত অসম্ভব হয়ে পড়বে।’
ট্রুথ সোশ্যালের ওই পোস্টে তিনি আরও বলেন, ‘আমি ভালো অর্থ কোনো খারাপ জায়গার পেছনে খরচ করতে চাই না।’
এর আগে গত রোববার সিবিএস নিউজের ‘সিক্সটি মিনিটস’ অনুষ্ঠানে এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, ‘যদি আপনার শহর একজন কমিউনিস্ট দ্বারা পরিচালিত হয়, তাহলে নিউইয়র্কে অর্থ দেওয়া আমার পক্ষে কঠিন হবে। কারণ আপনি মূলত সেই অর্থ নষ্ট করছেন।’
অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, কোন শহর ফেডারেল তহবিল থেকে কি পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ পাবে সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো এখতিয়ার প্রেসিডেন্টের নেই। মূলত এ সিদ্ধান্ত নেয় কংগ্রেস। এমনকি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রেসিডেন্টের অর্থ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ বা আটকে রাখার ক্ষমতা (যা আইনত নিষিদ্ধ) নিয়েও আইনি বিতর্ক বেড়েছে।
কেবল মামদানিই নয়, রিপাবলিকান মেয়র প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়ারও বিরোধিতা করছেন ট্রাম্প। তার মতে, স্লিওয়াকে ভোট দেওয়া মানেই ‘মামদানিকে ভোট’ দেওয়া। এই দুই প্রার্থীর পরিবর্তে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও প্রাক্তন গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমোকে সমর্থনের ইঙ্গিত দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তিনি লেখেন, ‘আমি একজন কমিউনিস্ট কিংবা অনভিজ্ঞের থেকে একজন ডেমোক্র্যাটকে জয়ী দেখলে খুশি হব। অন্তত তাদের রেকর্ড ব্যর্থতায় ভরা নয়।’

এদিকে সোমবার সন্ধ্যায় কুইন্সের অ্যাস্টোরিয়ায় এক প্রচারসভায় মামদানি ট্রাম্পের হুমকির জবাবে বলেন, ‘গত কয়েক মাস ধরেই আমি জানতাম, ট্রাম্প কুয়োমোকেই সমর্থন করবেন।’
‘তিনি (ট্রাম্প) নিরপেক্ষতার যে ভান ধরেছিলেন, নিউইয়র্কবাসীর সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার যে আশ্বাস ছিল, শেষ মুহূর্তে সব গুজব প্রমাণিত হলো। তার হস্তক্ষেপের যে আশঙ্কা ছিল, তা এখন নগ্ন ও নির্লজ্জভাবে প্রকাশিত। মাগা আন্দোলনের অ্যান্ড্রু কুয়োমোর প্রতি ট্রাম্পের সমর্থন এটাই প্রমাণ করছে, নিউইয়র্কবাসীর জন্য নয়, বরং ট্রাম্প তার নিজের প্রশাসনের জন্যই কুয়োমোকে সেরা মেয়র হিসেবে বেছে নিতে চাইছেন। তিনি হবেন ট্রাম্পের পুতুল’, যোগ করেন মামদানি।
তিনি আরও বলেন, ‘এই হুমকিকে আমি হুমকি হিসেবেই দেখব। এটি কোনো আইন নয়। আমরা প্রায়ই কেবল ট্রাম্প বলেছেন বলেই তাকে আইনি বাস্তবতা হিসেবে ধরে নেই, যা ভুল।’
মামদানী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘নিউইয়র্ক সিটি যে ফেডারেল তহবিল পায়, তা ট্রাম্প আমাদের “দিচ্ছেন” না। এটি আমাদের অধিকার।’
জোহরান মামদানি তার ফিলিস্তিনপন্থী বিশ্বাস এবং শহরের বাসিন্দাদের মৌলিক চাহিদা পূরণের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রগতিশীল রাজনীতিক হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তিনি নিজেকে ‘ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট’ বা গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিলেও বিভিন্ন সময় ডেমোক্র্যাট শিবিরের অনেক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা ও ইসরায়েলপ্রীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়ে নিউইয়র্কবাসীর মনে জায়গা করে নিয়েছেন।
তার নির্বাচনি ইশতেহারের মধ্যে রয়েছে শহরের অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস, আগামী ১০ বছরে দুই লাখ সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন ইউনিট নির্মাণ, বাস ভাড়া সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা, সরকারি ব্যবস্থাপনায় মুদি দোকান স্থাপন করে খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করা, বড় প্রতিষ্ঠান ও উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ওপর বাড়তি কর আরোপের মাধ্যমে শিক্ষা, শিশুর যত্ন ও সামাজিক সেবা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, পুলিশ-নির্ভরতা কমিয়ে সামাজিক ও কমিউনিটি-ভিত্তিক নিরাপত্তা উদ্যোগ জোরদার করার মতো বিষয়।

অন্যদিকে ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া কুয়োমো মূলত ডেমোক্র্যাটিক রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত। তবে মেয়র নির্বাচনের প্রচার শুরুর আগে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ার ঘোষণা দেন। ট্রাম্পের পোস্টের পরপরই ৭৭ডব্লিউএবিসি রেডিওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কুয়োমো জানান, তার জয়-পরাজয় রিপাবলিকান ভোটারদের ওপর নির্ভর করছে। স্লিওয়ার পরিবর্তে এই ভোট তার ঝুলিতে এলে জয়ের পথ অনেকটাই সহজ হবে বলে মনে করেন কুয়োমো। তিনি বলেন, ‘এখন এটা রিপাবলিকানদের ওপর নির্ভর করছে। আমি আশা করি তারা প্রেসিডেন্টের কথা শুনবেন।’
ফক্স নিউজে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কুয়োমো বলেন, ‘আমাদের এমন একজন মেয়র দরকার, যিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে দাঁড়াতে পারবেন। তার সমকক্ষ হয়ে শহরের কল্যাণে নির্ভয়ে কাজ করবেন।’
তবে মামদানি জয় পেলে শহরের অর্থ বন্ধ হতে পারে বলে শঙ্কা জানান তিনিও। কুয়োমোর ভাষায়, ‘ট্রাম্প মামদানিকে এমনভাবে মোকাবেলা করতে চাইবেন, ঠিক যেভাবে গরম ছুরি দিয়ে নরম মাখন কাটা হয়।’
ভোটের আগে ৩০ অক্টোবর এটোলাস ইন্টেলের সমাপনী জরিপ অনুযায়ী, ৪১ শতাংশ নিউইয়র্কবাসীর ভোট সমর্থন পেয়ে অন্তত ১০ পয়েন্টে এগিয়ে আছেন মামদানি। অন্যদিকে কুয়োমোর সমর্থন ৩৪ শতাংশ এবং স্লিওয়ার পেয়েছেন ২৪ শতাংশ ভোট সমর্থন।


