নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ১৩৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকার বকেয়া মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ফাঁকি শনাক্ত করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এনবিআর-এর একটি আনুষ্ঠানিক নিরীক্ষায় এই বিপুল পরিমাণ ভ্যাট ফাঁকির তথ্য উঠে এসেছে।
এনবিআর-এর বৃহৎ করদাতা ইউনিট (ভ্যাট) ২০২১-২২ এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে কোম্পানির লেনদেনগুলো পর্যালোচনা করে এই নিরীক্ষা সম্পন্ন করে। বকেয়া এই অর্থের মধ্যে মূল ভ্যাটের পাশাপাশি অর্জিত সুদ এবং জরিমানাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (ভ্যাট) কমিশনার সৈয়দ আতিকুর রহমান টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, নিরীক্ষার সময় উল্লেখযোগ্য গরমিল পাওয়া গেছে। এই অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকির মামলা দায়ের করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, কোম্পানিটি উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করে অর্থ পরিশোধে বিলম্ব করার চেষ্টা করেছিল। তবে আদালত এনবিআর-এর পক্ষে রায় দিয়েছে। এর ফলে ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব এড়িয়ে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই।
সৈয়দ আতিকুর রহমান বলেন, উচ্চ আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হলে বকেয়া পাওনা আদায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে কোম্পানির বিক্রয় প্রতিবেদন, দাখিলকৃত ভ্যাট রিটার্ন এবং আর্থিক বিবরণীর মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি চিহ্নিত করা হয়। এতে বলা হয়, প্রকৃত বিক্রয় কম দেখানো হয়েছে এবং উৎপাদন ও সরবরাহের পর্যাপ্ত রেকর্ড রাখা হয়নি। এছাড়া সফটওয়্যার ভিত্তিক হিসাবের সঙ্গে ম্যানুয়াল হিসাবের গরমিল পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারিত ফরমে বিক্রয় তথ্য জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, উৎপাদিত ও সরবরাহকৃত পণ্যের সঙ্গে ঘোষিত ভ্যাটের কোনো মিলও পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এসব অনিয়মের মাধ্যমে প্রকৃত করযোগ্য বিক্রয় গোপন করা হয়েছে। এটি সরকারের রাজস্ব সংগ্রহের জন্য একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।
কোম্পানির অনুরোধে দ্বিতীয়বার নিরীক্ষা চালানো হলেও প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের বেশিরভাগই বহাল থাকে। এই নিরীক্ষা প্রতিবেদনেও বলা হয়, বিক্রয় রেকর্ড এবং রিটার্নের অসঙ্গতিগুলো সমাধান করা যায়নি। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দেওয়া ব্যাখ্যা এবং নথিপত্র এসব সমস্যা সমাধানের জন্য পর্যাপ্ত ছিল না।
নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাঈদ আহমেদ এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি সম্প্রতি এই পদে যোগদান করেছেন বলে জানান।
এনবিআর-এর পাওয়া অনিয়মসমূহ
এনবিআর নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসে বিক্রয় রেকর্ডে বড় ধরনের গরমিল, ভুল তথ্য প্রদান, নথিবহির্ভূত লেনদেন এবং প্রযোজ্য কর পরিশোধ না করার প্রমাণ পেয়েছে। নিরীক্ষায় দেখা গেছে, কোম্পানির আর্থিক বিবরণী এবং দাখিল করা রিটার্নের তথ্যে কোনো মিল নেই।
এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত ফরমে সঠিক রেকর্ড রাখা বাধ্যতামূলক। এ ধরনের নিয়ম লঙ্ঘন রাজস্ব আহরণকে বাধাগ্রস্ত করে।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অবস্থিত নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস এনবিআর-এর কাছে লিখিত জবাব দিয়েছে। তারা জানায়, নিরীক্ষাকালীন সময়ে কোম্পানিটি শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, জর্জিয়া, কেনিয়া এবং টোগোসহ বিভিন্ন দেশে ১০৫টি চালান রপ্তানি করেছে।
প্রতিষ্ঠানটি যুক্তি দেয়, ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আইন ২০১২-এর ২১ ধারা অনুযায়ী রপ্তানি পণ্যের ওপর ভ্যাট প্রযোজ্য নয়। তাদের দাবি, তারা প্রায় ৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা ভ্যাট থেকে অব্যাহতি পাওয়ার যোগ্য।
কোম্পানিটি আরও দাবি করে, নিরীক্ষা দল মাসিক ভ্যাট-৯ রিটার্নের ভিত্তিতে ভ্যাট গণনা করেছে যেখানে রপ্তানি বিল অন্তর্ভুক্ত ছিল। নাভানা মনে করে, রপ্তানি পণ্য বাদ দিলে ভ্যাটের পরিমাণ কমে ৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা হতো।
এনবিআর-এর দাবি করা অতিরিক্ত ৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা বাতিলযোগ্য বলে দাবি করে নাভানা। তারা এ বিষয়ে রপ্তানি বিল এবং পিআরসি-সহ প্রয়োজনীয় নথি এনবিআর-এর কাছে জমা দিয়েছে।
তবে এনবিআর-এর নিরীক্ষা কমিটি বলেছে, বিক্রয় রেজিস্টারে সমস্ত বিক্রয় তথ্য সম্পূর্ণভাবে নথিভুক্ত থাকতে হবে।
নিরীক্ষায় দেখা গেছে, কোম্পানির এমআইএস অনুযায়ী মোট রপ্তানি মূল্য প্রায় ৪১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। কিন্তু তাদের বিক্রয় রেজিস্টারে তা দেখানো হয়েছে ৬৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। মূলত এই গরমিলের ওপর ভিত্তি করেই ভ্যাট দাবি করা হয়েছে।
কমিটি ‘নাভাট্রিম সাসপেনশন’ ওষুধের উৎপাদন সংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। কোম্পানিটি বলেছে, হিসাবের ভুলের কারণে উৎপাদন সংখ্যা প্রায় ১৫ কোটি ৫৮ লাখ ইউনিট বেশি দেখানো হয়েছে। যার মূল্য প্রায় ২৮৬ কোটি ২১ লাখ টাকা এবং এর বিপরীতে ভ্যাট দাঁড়ায় ৪২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
নাভানা জানায়, প্রকৃত উৎপাদন ছিল ১২ লাখ ৯৮ হাজার ইউনিট যার মূল্য প্রায় ২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। এর প্রকৃত ভ্যাট ৩৫ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। এই ওষুধটি অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রি হয় না এবং এটি শুধুমাত্র দরপত্র ও রপ্তানির জন্য উৎপাদিত হয়।
নিরীক্ষা কমিটি তাদের প্রতিবেদনে জানায়, বিক্রয় রেজিস্টার হলো একটি প্রধান নথি এবং এতে বারবার ভুল গ্রহণযোগ্য নয়। তারা কাঁচামালের ব্যবহার, উৎপাদন, ক্রয় এবং ইনভেন্টরি তথ্যের সঙ্গে বিক্রয় হিসাবের অসঙ্গতি পেয়েছে। এছাড়া নথিবদ্ধ আমদানির বাইরে কাঁচামাল সংগ্রহ করা হয়েছিল কি না সে বিষয়েও কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। এই সব দিক বিবেচনা করে কমিটি আগের ভ্যাট দাবির পক্ষেই সুপারিশ করেছে।


