ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বৃহস্পতিবার। নতুন এই সংসদকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে নানা প্রত্যাশা। নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং চাঁদাবাজিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাকে সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
এ ছাড়া, দুর্নীতি দমন, কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য, ব্যবসাবান্ধব নীতি ও তরুণদের জন্য টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চান নাগরিকরা।
রাজধানীর রাস্তায় রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন রবিউল ইসলাম। প্রতিদিনের আয়ে কোনোমতে তার সংসার চলে। নতুন সংসদের কাছে তার চাওয়া খুবই সহজ। তিনি বলেন, চাল-ডাল, তেলসহ জিনিসের দাম কমাতে হবে। এ ছাড়া, রিকশা চালাতে গিয়ে যেন চাঁদা দিতে না হয়।
উদ্যোক্তারাও নতুন সংসদের দিকে তাকিয়ে আছেন। ফিউচার পাথ স্কিল অ্যান্ড জব প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা আশিকুর রহমান মনে করেন, ব্যবসা ও উদ্যোগের পরিবেশ উন্নত করতে হলে দুর্নীতি কমাতে হবে।
তিনি বলেন, উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা জরুরি।
গ্রামাঞ্চলের কৃষকরাও নতুন সংসদের কাছ থেকে বাস্তব পরিবর্তন আশা করছেন। চুয়াডাঙ্গার প্রান্তিক কৃষক শাহজাহান আলী বিশ্বাস বলেন, সার, বীজ ও সেচের খরচ বেড়েছে, কিন্তু ফসলের দাম বাড়েনি। ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। ফসল সংরক্ষণের জন্য ভালো ব্যবস্থা করতে হবে।
শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারের উদ্বেগ বাজারদর। গৃহিণী সাজেদা খাতুন বলেন, চাল, ডাল, তেল, গ্যাস-সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। সংসার চালানো এখন খুব কঠিন। নতুন সরকারকে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তরুণদের প্রত্যাশাও অনেক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী রাজেদুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রধান প্রত্যাশা। চাকরিতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। তরুণদের যেন বেকারত্ব ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে না হয়।
দেশের একটি বেসরকারি ব্যাংকের চাকরিজীবী জুনায়েদ ইকবাল বলেন, নতুন সংসদের কাছে প্রত্যাশা একটি দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের। অর্থ পাচাররোধে নতুন সরকারের ভূমিকা রাখতে হবে। এ ছাড়া, বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সারওয়ার আহমেদ গুরুত্ব দিচ্ছেন ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন ও প্রকৃত বিচারিক স্বাধীনতার ওপর। তিনি বলেন, বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করাই হবে নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। অতীতের মতো হয়রানিমূলক মামলা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা যেন না থাকে সেই প্রত্যাশাও করেন তিনি।
যশোরের অভয়নগরের সৌরভ রাজধানীতে মুচির কাজ করেন। তিনি এখনো জানেন না তার এলাকার সংসদ সদস্য কে নির্বাচিত হয়েছেন। তবে নতুন সরকারের কাছে তার প্রত্যাশা-নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো যেন বাস্তবায়ন করা হয়।
তিনি বলেন, ‘জিনিসপত্রের দাম কমাতে হবে। এখন সংসার চালানো খুব কঠিন হয়ে গেছে। আর সরকার যে কার্ড দেওয়ার কথা বলেছিল, সেটি যেন আমাদের মতো গরিব মানুষরা পায়।’
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আতিয়ার রহমান বলেন, “আশা করছি সরকার ব্যবসায়ীবান্ধব নীতি গ্রহণ করবে। আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণ পাওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’
অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে স্থিতিশীলতাকে সবচেয়ে জরুরি মনে করছেন বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. রেজওয়ান সেলিম। তিনি বলেন, ‘বন্দর ও ব্যাংকিং খাতের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করতে হবে। আশা করছি নতুন সরকার সমস্যা সমাধানে কাজ করবে।’
বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যেও নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা রয়েছে। প্রবাসী তানজিদ বলেন, অভিবাসীদের শুধু রেমিট্যান্স আয়ের উৎস হিসেবে দেখা উচিত নয়, তাদের উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তারা সক্রিয় দূতাবাস সেবা, বিমানবন্দরে হয়রানি বন্ধ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং দেশে ফেরার পর পুনর্বাসনের কাঠামোগত সহায়তা চান।
মালয়েশিয়ার ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে হিউম্যান সায়েন্স ইন কমিউনিকেশন বিষয়ে স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী নাঈম হাসান বলেন, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও সহিংসতা দমনে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, রাজধানীর ট্রাফিক সমস্যা সমাধান এবং বাজারে সিন্ডিকেট ও খাদ্যে ভেজাল রোধেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।


