ভক্তি, শ্রদ্ধা আর তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল প্রাঙ্গণে ধরণীর বুকে নেমে এসেছেন বিদ্যার দেবী সরস্বতী। শুক্রবার সকাল থেকেই শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর ভক্তদের বিনম্র পুষ্পাঞ্জলিতে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো হল এলাকা।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী সরস্বতী হলেন জ্ঞান, বিদ্যা ও সৃষ্টিশীলতার পরম উৎস। প্রতি বছরের মতো এবারও মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের এই পবিত্র শ্রীপঞ্চমী তিথিতে জগন্নাথ হলে আয়োজিত হয়েছে জাঁকজমকপূর্ণ এই বাণী অর্চনা। পুরো বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে এই পূজা এক বিশেষ আকর্ষণ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মেলবন্ধন সৃষ্টি করেছে।
উৎসবের আমেজে আপ্লুত গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী সুজিৎ বকশী সৌরভ জানান, ‘ইতিমধ্যে দুইবার অঞ্জলি দেওয়া হয়েছে। অঞ্জলি দিতে পেরে সত্যিই ভালো লাগছে।’
ঐতিহ্যগতভাবে জগন্নাথ হলই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সরস্বতী পূজার মূল প্রাণকেন্দ্র। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এবারও হলের পুকুরের মাঝখানে চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের তুলিতে গড়া এক অপূর্ব প্রতিমা স্থাপন করা হয়েছে, যা আগত দর্শনার্থীদের বিমোহিত করছে।
এবারের পূজার বিশেষত্ব হলো হলের বিশাল খেলার মাঠজুড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ৭৬টি দৃষ্টিনন্দন মণ্ডপ। বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা পরম মমতায় নিজেদের হাতে গড়ে তুলেছেন এসব শৈল্পিক মণ্ডপ, যার অধিকাংশই তৈরি হয়েছে সমসাময়িক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন ‘থিম’ বা প্রেক্ষাপটকে ঘিরে।
মণ্ডপগুলোতে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতার কোনো কমতি নেই। ফাইন্যান্স বিভাগ তাদের মণ্ডপ সাজিয়েছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আদলে আলোকসজ্জা ও আলপনায়। এদিকে ইংরেজি বিভাগ এবারই প্রথম সম্পূর্ণ হাতে এঁকে তাদের মণ্ডপ তৈরি করে চমক দিয়েছে। ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী লক্ষ্মীকান্ত রায় বলেন, ‘আগে ফোম বা শলা দিয়ে মণ্ডপ তৈরি করা হলেও এবার পুরোটা হাতে এঁকে করা হয়েছে।’ আর ফাইন্যান্স বিভাগের এক শিক্ষার্থী আশাবাদী কণ্ঠে জানালেন, সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে কাজ চলছে এবং রাতের মায়াবী আলোকসজ্জায় তাদের মণ্ডপটি এক অনন্য নান্দনিক রূপ নেবে।
উৎসবের আনন্দকে নির্বিঘ্ন করতে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন ও শিক্ষা), কোষাধ্যক্ষ ও প্রক্টরবৃন্দের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে পুরো এলাকা সুরক্ষিত রাখা হয়েছে। নিরাপত্তার চাদর গড়ে তুলতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস নিরলস কাজ করছে। সিসি ক্যামেরার আওতায় পুরো জগন্নাথ হল এলাকা, প্রবেশপথে বসানো হয়েছে মেটাল ডিটেক্টর।
দর্শনার্থী মা ও শিশুদের সুবিধার্থে স্থাপন করা হয়েছে নিরাপদ দুগ্ধসেবন কর্নার। উৎসবের পবিত্রতা রক্ষায় পটকা বা আতশবাজির ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া যানবাহন নিয়ন্ত্রণে বিশেষ স্টিকার ব্যবস্থা এবং ফায়ার সার্ভিসের অংশগ্রহণে অগ্নিনির্বাপন মহড়াও সম্পন্ন করা হয়েছে।
দুদিনব্যাপী এই বর্ণিল উৎসবে থাকছে প্রসাদ বিতরণ, সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা ও রক্তদান কর্মসূচির মতো মানবিক আয়োজন। ছোটদের বিনোদনের জন্য মেলায় রয়েছে হরেক রকম রাইড, খেলনা ও মুখরোচক খাবারের দোকান।


