এইচ. এম. নজরুল আলম: বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধান শহরগুলোর মহাপরিকল্পনাগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। এটি এক স্পষ্ট পরিকল্পনাগত ব্যর্থতা, যার আর কোনো অজুহাত দেওয়া যায় না। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং খুলনার মতো শহরগুলো দ্রুত বড় হচ্ছে। অথচ তাদের মূল পরিকল্পনাগুলোতে পরিবেশ নিয়ে ভবিষ্যৎ চিন্তা নেই। নীতিমালার বড় বড় কথা এবং শহরের আসল বাস্তবতার মধ্যে অনেক পার্থক্য।
যেমন, ঢাকার রাজউক ১৯৯৫ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত যে পরিকল্পনা তৈরি করেছিল, তাতে জলবায়ু পরিবর্তনের কোনো উল্লেখ ছিল না। শুধু ২০১৬ সালে একটি বিস্তারিত আঞ্চলিক পরিকল্পনা তৈরির সময় জলবায়ু সহনশীলতার বিষয়টিকে যুক্ত করা শুরু হয়। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ(সিডিএ) তাদের ১৯৯৫-২০১৫ সালের মাস্টার প্ল্যান এবং ১৯৯৫-২০০৫ সালের নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা – দুটিতেই এই বিষয়টি বাদ দিয়েছে। কক্সবাজারও তার ২০১১-২০৩১ সালের পরিকল্পনায় জলবায়ু ঝুঁকির কথা সামান্যই স্বীকার করেছে। খুলনা তিনটি পরিকল্পনা তৈরি করেছে, কিন্তু কোনোটিতেই জলবায়ু অভিযোজনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এমনকি রাজশাহীও প্রথমে এবিষয়টি উপেক্ষা করেছে। পরে ২০২২-২০৪১ সালের সংস্করণে এটি নিয়ে কাজ শুরু করে।
এই প্রবণতাটি খুবই আশ্চর্যজনক। কারণ জলবায়ু ঝুঁকি এখন শুধু তাত্ত্বিক ধারণা নয়, এটি একটি বাস্তব সত্য। ঢাকা এখন বিশ্বের যে ১০ শতাংশ শহর চরম আবহাওয়া এবং জলবায়ু সম্পর্কিত ক্ষতির ঝুঁকিতে আছে, তার একটি। গবেষণায় দেখা যায়, কংক্রিটের কাঠামো বেড়ে যাওয়া এবং সবুজ এলাকা কমে যাওয়ার কারণে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা এবং গাজীপুরের মতো শহরগুলোর তাপমাত্রা বাড়ছে।
কর্মকর্তারা প্রায়ই বলেন, যখন এই পরিকল্পনাগুলো তৈরি হয়েছিল, তখন জলবায়ু পরিবর্তন ছিল ‘নতুন ধারণা’। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকেই বিশ্বজুড়ে নগর নীতিতে অভিযোজন শুরু হয়ে গিয়েছিল। ২০০০ পরপরই জলবায়ু সহনশীলতা আন্তর্জাতিক পরিকল্পনার মূল অংশ হয়ে ওঠে। তাই জলবায়ু বিষয়কে বাদ দেওয়ার কারণ অজ্ঞতা নয়, বরং অগ্রাধিকার নির্ধারণে ভুলের জন্যই নগর পরিকল্পনায় জলবায়ু বিষয় বাদ পড়ে।
এমন পরিকল্পনার প্রধান সমস্যা হলো, উন্নয়ন এবং পরিবেশকে একে অপরের বিপরীত হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশের নগর পরিকল্পনা সাধারণত জমি ব্যবহার, রিয়েল এস্টেট এবং অবকাঠামো বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেয়। ফলে পরিবেশগত সহনশীলতা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ প্রায়ই বাদ পড়ে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনকে শহরের নকশার মূলনীতি না ভেবে এটি পরে যুক্ত করার বিষয় হিসেবে দেখা হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, স্বল্পমেয়াদী অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে পরিবেশের উদ্বেগগুলো গৌণ।
কক্সবাজারের উদাহরণ দেখায় এই মানসিকতা কতটা বিপজ্জনক। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে এটি নিয়মিত জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় ভূমিক্ষয়ের ঝুঁকিতে থাকে। অথচ এর মাস্টার প্ল্যান এই দুর্বলতাগুলো নিয়ে নীরব। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বা ঝড়ের কথা মাথায় না রেখে তৈরি করা অবকাঠামো ভবিষ্যতে বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। শুরুতে জলবায়ু সহনশীলতা যুক্ত করতে যে খরচ হতো, পরে তা করতে তার চেয়ে অনেক বেশি খরচ হবে।
খুলনার ব্যর্থতা আরও স্পষ্ট। জলাভূমি ভরাট করে নির্মাণ কাজ চলছে এবং অপরিকল্পিত বসতিগুলোতে ড্রেনেজ বা বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা নেই। এর ফলে শহরটি আরও গরম, শুকনো এবং বন্যাপ্রবণ হয়ে উঠছে। পানি নিষ্কাশনের পথ হারানোর কারণে চাপ বৃদ্ধি ও শহুরে বন্যা বেড়েছে বলে গবেষণায থেকে জানা যায়। জলবায়ুর প্রভাব বিবেচনা না করে এভাবে শহর তৈরি করলে বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য প্রতিরোধের চেয়ে অনেক বেশি সম্পদ খরচ করতে হবে।
মাস্টার প্ল্যান জলবায়ু পরিবর্তনকে উপেক্ষা করলে বেশ কিছু ঝুঁকি বাড়ে। যেমন, ভবিষ্যতের জলবায়ু অনুযায়ী ডিজাইন করা না হলে রাস্তা ও ভবনগুলো ভারী বৃষ্টিপাত বা বন্যায় প্রায়ই ভেঙে পড়ে। দরিদ্র মানুষরা জলবায়ু আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন, অথচ তারা প্রায়ই পরিকল্পনার আলোচনা থেকে বাদ পড়েন। পরিবেশগত চাপ সহ্য করার জন্য তৈরি না হলে রিয়েল এস্টেট বা পরিবহন ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী মূল্য কমে যায়। এছাড়া, বারবার পরিকল্পনা সংশোধন বা অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করতে হলে জনগণের আস্থা কমে যায়।
তবে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সালে ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন তাদের প্রথম জলবায়ু কর্মপরিকল্পনা চালু করেছে। নারায়ণগঞ্জ প্রথম শহর হিসেবে জলবায়ু কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ৫৬ কোটি ডলারের একটি প্রকল্প জলবায়ু সহনশীল নগর অবকাঠামোতে সহায়তা করছে। এগুলো উৎসাহব্যঞ্জক পদক্ষেপ, তবে এখনো সীমিত আকারের।
অর্থপূর্ণ পরিবর্তনের জন্য, কর্তৃপক্ষের উচিত হবে শুধু নথিপত্রে জলবায়ু শব্দটি ব্যবহার না করা। সহনশীলতাকে মূল ভিত্তি ধরে পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। জলবায়ু-সংবেদনশীল জোনিং, জলাভূমি পুনরুদ্ধার, সবুজ অবকাঠামো এবং বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থাকে শহরের জন্য অপরিহার্য সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে। নগর নকশার কেন্দ্রে থাকতে হবে তাপ নিয়ন্ত্রণ, ড্রেনেজ নিশ্চিত করা এবং সবুজ করিডোর তৈরি। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মতো শহরে বেঁচে থাকার জন্য এই ব্যবস্থাগুলো জরুরি।
পরবর্তী প্রজন্মের নগর পরিকল্পনাকে তিনটি জরুরি নীতি দিয়ে পরিচালিত করতে হবে। প্রথমত, প্রতিটি বিদ্যমান পরিকল্পনাকে জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়ন ও অভিযোজন কাঠামো দিয়ে আপডেট করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতের সমস্ত অবকাঠামো প্রকল্পকে জলবায়ু পরিস্থিতি অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ করতে হবে, যার মাধ্যমে দুর্বল জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। তৃতীয়ত, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে জলবায়ু-সহনশীলতা বাধ্যতামূলক করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশের শহরগুলো এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। যদি তাদের উন্নয়ন নকশা থেকে জলবায়ু ঝুঁকি বাদ থাকে, তবে দেশের নগর ভবিষ্যৎ হবে শুধু পুনরুদ্ধারের, টেকসই বৃদ্ধির নয়। জলবায়ু সংকটকে আর অন্য কারও সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এখন জলবায়ু পরিবর্তনকে পরিকল্পনার নথিতে একটি ছোট টীকা হিসাবে না রেখে কেন্দ্রীয় বিষয় বানানোর সময় এসেছে।


