বাংলাদেশে মাদক ব্যবহার একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকটে রূপ নিয়েছে। দেশে বর্তমানে আনুমানিক ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অবৈধ মাদক ব্যবহার করছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। সিগারেট সেবনকে এই হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে।
রোববার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) ও রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্টস লিমিটেড (আরএমসিএল) যৌথভাবে পরিচালিত জাতীয় পর্যায়ের এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
‘বাংলাদেশে মাদক অপব্যবহারকারী ব্যক্তিদের সংখ্যা, ধরণ ও সংশ্লিষ্ট কারণসমূহ’ শীর্ষক গবেষণার ফল প্রকাশ উপলক্ষে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের কনফারেন্স হলের ৫০৪ নম্বর কক্ষে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক মো. শাহিনুল আলম। তিনি বলেন, ‘এটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে কিছু খারাপ মানুষ শুধু মাদকাসক্ত এবং আমরা বা আমাদের সন্তানেরা নিরাপদ। বাস্তবতা হলো আমরা সবাই ঝুঁকির মধ্যে আছি। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।’ তিনি সবাইকে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, ‘মাদক প্রতিরোধ একটি সামাজিক যুদ্ধ। পরিবার থেকে মাদক নির্মূলে প্রতিরোধ শুরু করতে হবে।’
তিনি জানান, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবা বিস্তারের লক্ষ্যে ঢাকা ছাড়াও সাতটি বিভাগে ২০০ শয্যার সাতটি মাদকাসক্ত নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের একটি প্রকল্প সরকার অনুমোদন দিয়েছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক নাহরীন আখতার মাদক সরবরাহের উৎস ও চাহিদা কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘শিশু ও তরুণরা জীবনকে পুরোপুরি বোঝার আগেই মাদকের ফাঁদে পড়ছে। এই প্রজন্মকে রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।’
গবেষণাটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে নেটওয়ার্ক স্কেল-আপ মেথড (জরিপ পদ্ধতি) ব্যবহার করে দেশের আটটি বিভাগের ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলায় তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, বিভাগ ভেদে মাদক ব্যবহারের হারে পার্থক্য রয়েছে। ময়মনসিংহ বিভাগে মাদক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি ৬ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। এরপর রংপুর ৬ দশমিক শূন্য শূন্য শতাংশ এবং চট্টগ্রাম ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। রাজশাহী বিভাগে হার সবচেয়ে কম ২ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং খুলনায় ৪ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ।
সংখ্যার হিসাবে সবচেয়ে বেশি মাদক ব্যবহারকারী ঢাকা বিভাগে, প্রায় ২২ লাখ ৮৮ হাজার জন। এরপর চট্টগ্রামে প্রায় ১৮ লাখ ৮০ হাজার এবং রংপুরে প্রায় ১০ লাখ ৮১ হাজার।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে বরিশালে ৪ লাখ ৪ হাজার, খুলনায় ৭ লাখ ২৬ হাজার, ময়মনসিংহে ৭ লাখ ৬১ হাজার, রাজশাহীতে ৫ লাখ ৬৭ হাজার এবং সিলেটে প্রায় ৪ লাখ ৮৮ হাজার মাদক ব্যবহারকারী রয়েছে।
সারা দেশে মোট মাদক ব্যবহারকারীর আনুমানিক সংখ্যা ৮১ লাখ ৯৪ হাজার ৬৫১ জন।
মাদক প্রকারভেদে গাঁজা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত। প্রায় ৬০ লাখ ৮০ হাজার মানুষ গাঁজা ব্যবহার করে। এরপর ইয়াবা বা মেথামফেটামিন ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ২২ লাখ ৯৩ হাজার। অ্যালকোহল ব্যবহার করে প্রায় ২০ লাখ ২১ হাজার মানুষ।
এ ছাড়া, কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপ ব্যবহারকারী প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার, হেরোইন ৩ লাখ ২৩ হাজার, ঘুমের ওষুধ ৩ লাখ ৬ হাজার এবং ইনহেল্যান্ট ব্যবহারকারী প্রায় ১ লাখ ৫৩ হাজার। ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৩৯ হাজার, যারা এইচআইভি, হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
গবেষণায় আরও জানা যায়, একজন মাদক ব্যবহারকারী গড়ে মাসে প্রায় ৬ হাজার টাকা ব্যয় করেন। অনেক ক্ষেত্রেই একজন ব্যক্তি একাধিক ধরনের মাদক ব্যবহার করেন।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সে প্রথম মাদক নেওয়া শুরু করেছে। ৫৯ শতাংশ শুরু করেছে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে।
বেকারত্ব, বন্ধুমহলের প্রভাব, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ এবং অনানুষ্ঠানিক পেশায় যুক্ত থাকা মাদক ব্যবহারের প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, মাদক সহজলভ্য।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা নিয়ে গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। মাত্র ১৩ শতাংশ মাদক ব্যবহারকারী কখনো চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা পেয়েছেন। যদিও অর্ধেকের বেশি ব্যবহারকারী মাদক ছাড়ার চেষ্টা করেছেন। তবে পর্যাপ্ত চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এবং সামাজিক ও আর্থিক সহায়তার অভাবে অধিকাংশ সফল হতে পারেননি। ব্যবহারকারীরা চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবা, কাউন্সেলিং এবং কর্মসংস্থান সহায়তাকে সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
প্রায় ৬৮ শতাংশ ব্যবহারকারী সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়ে অপবাদ ও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন বলে জানান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই গবেষণা প্রমাণ করে যে মাদক সমস্যা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়। এটি একটি জটিল জনস্বাস্থ্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা। তাই শাস্তিমূলক পদ্ধতির পাশাপাশি প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক পুনঃএকত্রীকরণকে অন্তর্ভুক্ত করে সমন্বিত জনস্বাস্থ্যভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ গোলাম আজম, কো-ইনভেসটিগেটর অধ্যাপক মো. তাজুল ইসলাম, ফোরকান হোসেন, বিএমইউর পরিচালক (হাসপাতাল) ইরতেকা রহমান, অতিরিক্ত পরিচালক মো. শাহিদুল হাসান বাবুলসহ সংশ্লিষ্টরা।


