দেশের আর্থিক খাতে সুদের হার কোন পর্যায়ে চলছে, তার একটি বাস্তবভিত্তিক ধারণা দিতে প্রথমবারের মতো লেনদেনভিত্তিক রেফারেন্স রেট প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বুধবার প্রকাশিত এই সূচকে একদিনের বাংলাদেশ ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট (বিওএফআর) নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং ঢাকা ওভারনাইট মানি মার্কেট রেট (ডিওএমএমআর) ১০ দশমিক ০৯ শতাংশ।
এর মাধ্যমে দেশের মুদ্রাবাজারে সুদের একটি আনুষ্ঠানিক মানদণ্ড চালু হলো, যা এখন থেকে প্রতিদিন প্রকাশ করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগের দিনের আন্তঃব্যাংক লেনদেনের ভিত্তিতে নির্ধারিত এই হারগুলো ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের জন্য দিনের শুরুতেই একটি নির্ভরযোগ্য নির্দেশক হিসেবে কাজ করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, একদিনের বিওএফআর নির্ধারণ করা হয়েছে আগের দিনের ৩২টি আন্তঃব্যাংক রেপো লেনদেনের গড় সুদের হার বিশ্লেষণ করে, যেখানে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৪২৩ কোটি ১৪ লাখ টাকা। একইভাবে এক সপ্তাহের বিওএফআর নির্ধারণ করা হয়েছে ২০টি লেনদেনে ১০ হাজার ৫৪ কোটি টাকার ঋণের সুদের ভিত্তিতে, যা দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৬২ শতাংশ।
অন্যদিকে জামানতবিহীন আন্তঃব্যাংক লেনদেনের ভিত্তিতে নির্ধারিত ডিওএমএমআর একদিনের জন্য ১০ দশমিক ০৯ শতাংশ হয়েছে, যা নির্ধারণে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে ৪৫টি লেনদেনে ২ হাজার ২৩৬ কোটি টাকার ঋণের তথ্য। এক সপ্তাহের ডিওএমএমআর নির্ধারণ করা হয়েছে ৪২টি লেনদেনে ২ হাজার ৬৩৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকার ভিত্তিতে, যা দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ১৪ শতাংশ। এছাড়া পাঁচটি লেনদেনে ২৫০ কোটি টাকার ঋণের তথ্য ধরে এক মাসের ডিওএমএমআর ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং সাতটি লেনদেনে ১৮০ কোটি টাকার ঋণের ভিত্তিতে তিন মাসের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ।
এই রেফারেন্স রেটগুলো মূলত ঋণচুক্তি, বন্ড ও ফ্লোটিং রেটভিত্তিক পণ্যসহ বিভিন্ন আর্থিক চুক্তিতে সুদের হার নির্ধারণের একটি নির্দেশক হিসেবে ব্যবহৃত হবে। অর্থাৎ, ব্যাংকগুলো এই হারকে ভিত্তি ধরে এর সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট মার্জিন যোগ বা বিয়োগ করে ঋণের সুদ নির্ধারণ করতে পারবে।
বিওএফআর হলো ঝুঁকিমুক্ত সুদের হার, যা ব্যাংকগুলোর মধ্যে সরকারি সিকিউরিটিজ জামানত রেখে স্বল্পমেয়াদে নেওয়া ঋণের সুদের গড় থেকে নির্ধারিত হয়। অন্যদিকে ডিওএমএমআর নির্ধারিত হয় জামানত ছাড়া আন্তঃব্যাংক মানি মার্কেট লেনদেনের ভিত্তিতে, যেখানে ব্যাংকগুলো একে অপরকে সরাসরি ঋণ দেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, রেফারেন্স রেটের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি বা কম সুদ নির্ধারণ করা হলে কিংবা বাজারভিত্তিক সুদহারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা হলে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এখন বাজারভিত্তিক সুদের একটি নিজস্ব মানদণ্ড তৈরি হলো। আন্তর্জাতিকভাবে যেমন এসওএফআর (SOFR) রেট ব্যবহৃত হয়, তেমনি দেশে এখন বিওএফআর ও ডিওএমএমআর সেই ভূমিকা পালন করবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, নিয়মিতভাবে এই রেফারেন্স রেট প্রকাশের ফলে দেশের আর্থিক বাজারে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাজারের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবে।
গত জানুয়ারি থেকে পরীক্ষামূলকভাবে এই রেট নির্ধারণ এবং ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালানোর পর চূড়ান্তভাবে তা চালু করা হলো। এর মাধ্যমে দেশের মুদ্রাবাজারে সুদের হার নির্ধারণ আরও বাস্তবভিত্তিক ও শৃঙ্খলাপূর্ণ হবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।


