দুর্নীতি ও চাঁদাবাজবিরোধী কঠোর অবস্থান ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নে জোর দিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করেছে জামায়াতে ইসলামী। অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিচারব্যবস্থাসহ প্রায় ২৫টি খাতের উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে এই ইশতেহার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।
দলের একাধিক নেতা ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানান, তারা ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নারীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ টাইমস’কে বলেন, ‘সব ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তে সময়োপযোগী ইশতেহার তৈরি করা হয়েছে। এতে জুলাইয়ের চেতনা যেমন গুরুত্ব পেয়েছে, তেমনি মহান মুক্তিযুদ্ধও যথাযথ স্থানে রয়েছে।’
মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা এবং পরবর্তী সময়ে আইনি জটিলতায় একাধিকবার নিষিদ্ধ হওয়া জামায়াত এবার তাদের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনে বিশেষ নজর দিয়েছে। এজন্য ইশতেহারে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিদ্যমান সকল সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও ভাতা বহাল রাখার প্রতিশ্রুতি রাখা হয়েছে।
দলটির আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের টাইমস’কে বলেন, ‘এবারের ইশতেহার কেবল কিছু প্রতিশ্রুতি নয়, এটি রাষ্ট্র পরিচালনার একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা। আমরা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামতের প্রতিফলন ঘটিয়ে এটি প্রস্তুত করেছি।’
গত ২০ জানুয়ারি রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘পলিসি সামিটে’ জামায়াত তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের মূল কাঠামো স্পষ্ট করে। ৩৫টিরও বেশি দেশের কূটনীতিক এবং দেশের বিশিষ্টজনদের উপস্থিতিতে ওই সামিটে ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্র পরিচালনায় জামায়াতের দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রস্তাবিত সংস্কারের চিত্র তুলে ধরা হয়।
কী থাকছে ইশতেহারে
তরুণ ও জুলাই যোদ্ধাদের অগ্রাধিকার: ইশতেহারে তরুণ প্রজন্মকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ‘জুলাই যোদ্ধা’, শিক্ষিত বেকার যুবক এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির বিষয়টি এখানে প্রাধান্য পেয়েছে। যুবকদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জুলাই জাতীয় সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কার: দলীয় সূত্রগুলো জানায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে যেসব মৌলিক সংস্কারের প্রস্তাব এসেছে, সেগুলোর বাস্তবায়নই হবে জামায়াতের মূল লক্ষ্য। এর মধ্যে সংবিধান সংশোধন, নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার, প্রশাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি থাকছে।
দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিবিরোধী অবস্থান: জামায়াত মনে করে, দেশের উন্নয়ন ও বিনিয়োগের প্রধান বাধা হলো দুর্নীতি ও সুশাসনের অভাব। এ কারণে ইশতেহারে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি নির্মূলকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে ‘দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত দেশ গড়া’। ক্ষমতায় গেলে বিশেষ ‘শুদ্ধি অভিযান’ পরিচালনার ঘোষণাও থাকছে ইশতেহারে।
নারী অধিকার ও নিরাপদ কর্মক্ষেত্র: দেশের প্রায় ৫১ শতাংশ নারী ভোটারের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা সাজিয়েছে জামায়াত। দলটির নেতারা বলছেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে ‘শরিয়াহ আইন’ দিয়ে নারীদের ঘরবন্দি করবে—এমন ধারণা তারা বদলে দিতে চান।
ইশতেহারে নারীদের জন্য নিরাপদ, সম্মানজনক ও শঙ্কামুক্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে সমান সুযোগের অঙ্গীকার করা হয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই যোদ্ধাদের সম্মান: ঈশতেহারে জুলাই আন্দোলনে আহতদের কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসন এবং শহীদ পরিবারের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা থাকছে। একই সঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সকল রাষ্ট্রীয় সুবিধা বহাল রাখার বিষয়টিও নিশ্চিত করার কথা বলছে জামায়াত।
আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব: বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি বিশ্বাসযোগ্য দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চায় জামায়াত। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে তারা ‘ন্যায্যতার ভিত্তিতে’ সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখার কথা ইশতেহারে বলা হয়েছে। পাশাপাশি চীন, জাপান, মালয়েশিয়া ও তুরস্কসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে উন্নয়নের অংশীদারত্ব গড়ার পরিকল্পনা নিয়েছে দলটি।
সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা: ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে জামায়াত তাদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে মনে করে। দলটি বলছে, তারা জাতি, ধর্ম ও লিঙ্গ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে আপসহীন থাকবে। এ ছাড়া জামায়াত দেশের কোনো নাগরিককেই ‘সংখ্যালঘু’ হিসেবে চিহ্নিত করতে রাজি নয়। এই বিষয়টিও তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে।


