দিনাজপুরের সদর উপজেলার মোহনপুরে আত্রাই নদীর ওপর নির্মিত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাবার ড্যাম এখন স্থানীয় কৃষকদের জন্য আশীর্বাদের বদলে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দীর্ঘ তিন বছর ধরে ড্যামের রাবার ফুটো হয়ে থাকায় নদী এখন প্রায় পানিশূন্য। ফলে ভরা বোরো মৌসুমে সেচ সংকটে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন দুই উপজেলার ৮০টি গ্রামের প্রায় ৫ লাখ মানুষ। এক সময়ের প্রমত্তা নদী এখন ধু-ধু বালুচরে পরিণত হওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে কৃষি আবাদ।
সরেজমিনে দেখা যায়, ড্যামের রাবার ফুটো হয়ে পানি বেরিয়ে যাওয়ায় নদীর বুক এখন শুকিয়ে কাঠ। যেখানে এই সময়ে পানির কলতান থাকার কথা, সেখানে পানির অভাবে ফসলি জমি ফেটে চৌচির হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধানে ১৩৫ মিটার দৈর্ঘ্যের এই ড্যামটি একসময় এই অঞ্চলের কৃষিতে বিপ্লব ঘটিয়েছিল। ২৬ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই জলাধারের পানি দিয়ে কৃষকরা আগে অনায়াসেই বোরো চাষ করতে পারতেন। কিন্তু গত তিন বছর ধরে সেই দৃশ্য কেবলই স্মৃতি হয়ে আছে।
বিপাকে পড়া কৃষকদের হাহাকার এখন মাঠজুড়ে। চিরিরবন্দরের ভাবকী গ্রামের কৃষক আজগর আলী আক্ষেপ করে জানান, তিনি আড়াই বিঘা জমিতে বোরো আবাদের সব প্রস্তুতি নিয়েছেন।
প্রতি বছর নদীর পানি দিয়েই আবাদ করলেও এবার নদীতে এক ফোঁটা পানি নেই। এমন অবস্থায় জমি তৈরি বা চারা রোপণ করা কীভাবে সম্ভব হবে তা নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
মোহনপুর এলাকার কৃষক মোহাম্মদ আলী জানান, গত ৩-৪ বছর ধরে একই অবস্থা চলছে। মাঝেমধ্যে জোড়াতালি দিয়ে ড্যাম মেরামতের চেষ্টা করা হলেও তা কোনো কাজে আসেনি। নদী থেকে পানি না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে চড়া দামে ডিজেল কিনে শ্যালো মেশিন বসাতে হচ্ছে। এতে করে বোরো চাষের উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে সাধারণ কৃষকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
বর্তমানে ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই ড্যামটির ক্ষতিগ্রস্ত অংশ প্রতিস্থাপনের কাজ শুরু করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘প্রাইম ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন’।
চীন থেকে নতুন রাবার এনে তা বসানোর কাজ প্রক্রিয়াধীন। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের টেকনিশিয়ান আকবর আলী কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাধা হয়ে না দাঁড়ালে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে কাজ পুরোপুরি শেষ হবে।
কৃষকদের এই দীর্ঘদিনের ভোগান্তির কথা স্বীকার করেছেন এলজিইডি’র সদর উপজেলা প্রকৌশলী রিশাদ জামান। তিনি বলেন, রাবার ফুটো হওয়ায় বিগত ৩ বছর ধরে সেবা ব্যাহত হচ্ছে। তবে তারা বসে নেই, দ্রুত দরপত্র আহ্বান করে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন। আগামী দুই মাসের মধ্যে কৃষকরা পুনরায় সুফল পাবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
একসময় দেশের বৃহত্তম রাবার ড্যাম হিসেবে পরিচিতি থাকলেও বর্তমানে এটি দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের কাছে এর গুরুত্ব অপরিসীম হওয়ায় দ্রুত এই সংস্কার কাজ শেষ না হলে চলতি মৌসুমে বোরো লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।


