সুপ্রিম কোর্টে রাষ্ট্রের পক্ষে মামলা লড়তে বর্তমান সরকারের আমলে প্রায় সাড়ে তিনশ আইন কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭০ জনের বেশি আইন কর্মকর্তা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। দুই শতাধিক আইন কর্মকর্তা বিএনপি-জামায়াতের সক্রিয় অনুসারী।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাউস সংখ্যক আইন কর্মকর্তা নিয়োগ হলেও অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে তাদের স্থান সংকুলান হয় না। বসার জায়গা না পেয়ে অনেকেই নিজের চেম্বারে বসে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের কাজ সারেন। এই আইন কর্মকর্তাদের মধ্যে সিংহভাগই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যাপক সংখ্যক নিযুক্তির ফলে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় রাজনৈতিক কর্মীদের পুনর্বাসন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে কি না। রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয় করে এমন বিলাসিতা কেন?
প্রসঙ্গত, আপিল বিভাগের চারটি বেঞ্চসহ সর্বোচ্চ আদালতের বেঞ্চগুলোতে মামলা পরিচালনায় নিযুক্ত আছেন গড়ে চারজনের বেশি কর্মকর্তা। হাইকোর্টের কোনো কোনো বেঞ্চে ৬/৭ জনও থাকেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে নিযুক্ত আইন কর্মকর্তাদের এই সংখ্যা বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এই সংখ্যা দুশোর কিছু বেশি ছিল। তখন সেটিও ছিল নজিরবিহীন এবং প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নজিরবিহীন সেই নজিরও লঙ্ঘিত হয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, হাইকোর্টের প্রতিটি বেঞ্চে একজন করে মেধা ও যোগ্যতা সম্পন্ন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল (এএজি) হিসেবে ১৩২ জন এবং আপিল বিভাগে এই সংখ্যা সর্বোচ্চ ৩০ জনই যথেষ্ট। হাইকোর্টের কোনো কোনো বেঞ্চে অবশ্য দুয়ের অধিক আইন কর্মকর্তা থাকা দরকার। তবে সোয়া তিনশোর বেশি ডিএজি ও এএজির এই সংখ্যা শুধু নজিরবিহীনই নয় বরং অযৌক্তিক ও দৃষ্টিকটু। কারণ, এটি রাষ্ট্রের অর্থেরই অপচয়।
গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী, বিএনপির মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক মো. আসাদুজ্জামানকে অ্যাটর্নি জেনারেল পদে নিয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি। এর আগের দিন পদত্যাগ করেন আওয়ামী লীগ আমলে নিযুক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন। ওই সময় পর্যন্ত ২১৫ জন আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে ছিলেন। এর মধ্যে ১২ আগস্ট পর্যন্ত ৬৭ জন পদত্যাগ করেন।
এরপর ১৩ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুহাম্মদ আবদুল জব্বার ভুঁঞা, মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও মোহাম্মদ অনীক রুশদ হককে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল পদে নিয়োগের পাশাপাশি নয়জন আইনজীবীকে ডিএজি হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। এরপর ঢাউস আকারে আইন কর্মকর্তার নিয়োগ আসে ২৮ আগস্ট। ওইদিন সুপ্রিম কোর্টের ৬৬ জন আইনজীবীকে ডিএজি ও ১৬১ আইনজীবীকে এএজি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ আমলে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে নিযুক্ত সব আইন কর্মকর্তার নিয়োগ বাতিল করা হয়।
গত বছর ১৮ মার্চ আরও ৩৪ আইনজীবীকে এএজি পদে নিয়োগ করে সরকার। চতুর্থ দফায় গত ৪ নভেম্বর আরও ৪১ জন ডিএজির পাশাপাশি ৬৭ জন এএজি নিযুক্ত হন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গণঅভ্যুত্থানের পরে আগের সরকারের সময়কার নিযুক্তদের বাদ দিলেও, এর পরবর্তী সময়ে সবগুলো নিয়োগেই সুযোগ বুঝে আওয়ামী লীগ সমর্থক কিছু কিছু আইনজীবীকে আইন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ করা হয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দিন ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানান, সর্বশেষ নিয়োগের পরে ২৩৭ জন এএজি ও একশ’ ডিএজি কর্মরত ছিলেন। সম্প্রতি একজন ডিএজি অব্যাহতি নিয়েছেন ও একজনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তিনজন এএজি অব্যাহতি পেয়েছেন। বর্তমানে ৩৩২ জন এএজি ও ডিএজি নিযুক্ত রয়েছেন। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল তিনজন। অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামানের পদত্যাগের পরে সম্প্রতি অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আরশাদুর রউফকে অ্যাটর্নি জেনারেল পদের অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের সময়ে নিযুক্ত অন্তত ৭৮ জন আইন কর্মকর্তা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এর মধ্যে ৬৩ জন এএজি। তাদের মধ্যে কেউ কেউ কোর্টে নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না। বিএনপির মতাদর্শে বিশ্বাসী বিবেচনায় নিয়োজিত ১৮২ আইন কর্মকর্তার মধ্যে অন্তত ৬৪ জন ডিএজি।
এ ছাড়া, জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আছেন ২২, এনসিপির সমর্থকও আছেন ৫ জন আইন কর্মকর্তা। কয়েকজন আছেন বাম রাজনীতির সমর্থক।
সংশ্লিষ্টরা জানান, রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বাছবিচারহীনভাবে নিয়োগ করা হয়েছে। ফলে এমন কিছু ব্যক্তিও নিয়োগ পেয়েছেন, যারা আইন পেশায় নিয়মিত না, যাদের কোনো দিন সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে দেখা যায়নি। তারা বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও সুপ্রিম কোর্ট বারের পার্থক্যও বোঝেন না। বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির সুপারিশে, তাদের নিয়োগ করা হয়েছে। এরাই মূলত সংখ্যা ভারী করছেন।
সুপ্রিম কোর্টের একজন সিনিয়র আইনজীবী বলেন, সাধারণত আইন কর্মকর্তা পদে সরকার সমর্থক ও আস্থাভাজন ব্যক্তিকে নিয়োগ করা হয়। কারণ, এখানে সরকারকে বোঝার ব্যাপার থাকে; সরকার কি বলতে চায়, করতে চায়; তাও বুঝতে হয়। এখান থেকে তথ্য পাচারেরও সুযোগ থাকে। এতে রাষ্ট্র ও সরকারের স্বার্থ ক্ষুন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
প্রসঙ্গত, দ্য বাংলাদেশ ল’ অফিসার্স অর্ডার ১৯৭২ অনুযায়ী অ্যাটর্নি জেনারেলসহ অন্য আইন কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এই আইনে প্রয়োজনীয় সংখ্যক আইন কর্মকর্তা নিয়োগের বিধান রয়েছে, তবে কোনো সংখ্যা উল্লেখ নেই।
এক সময় অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আশরাফ-উজ-জামান। তিনি ‘টাইমস’কে বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত সরকারের আমলে নিযুক্ত আইন কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রায় তিনশজনই রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। শুধু তাই নয়, এর মধ্যে পতিত সরকারের সক্রিয় নেতাকর্মীও বড় একটি সংখ্যায় রয়েছেন। এর চেয়ে পরিহাস আর কী হতে পারে। অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় কি রাজনৈতিক কর্মীদের পুনর্বাসন কেন্দ্র?
একজন আইন কর্মকর্তার পক্ষে কি আদালতে শত শত মামলার ব্যাপারে প্রতিনিধিত্ব করা সম্ভব? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কেন সম্ভব নয়? একজন ডিএজি পাঁচশ মামলারও শুনানি করতে সক্ষম। একজন বিচারপতি পারলে ডিএজি পারবেন না কেন? একজন বিচারপতি কি একদিনে পাঁচশ মামলার শুনানি গ্রহণ করেন না? বিচারপতি আবদুল ওয়াহাব মিয়া একদিনে পাঁচশোরও বেশি মামলা নিষ্পত্তি করেছেন। মেধা ও যোগ্যতা থাকলে অবশ্যই সম্ভব।
চারদলীয় জোট সরকারের সময় অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন, এমন একজন আইন কর্মকর্তা ‘টাইমস’কে বলেন, তখন অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলসহ ১০৬ জন আইন কমকর্তা নিয়োজিত ছিলেন। এর মধ্যে ৭৬ জনই ছিলেন এএজি। আটর্নি জেনারেল ও তিনজন অতিরিক্ত আটর্নি জেনারেল ছিলেন, বাকিরা ডিএজি। তখন একটি কোর্টে দু-এক জনের বেশি আইন কর্মকর্তা ছিলেন না। কোনো কোনো কোর্টে হয়তো তিনজন ছিলেন।
সূত্র মতে, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এই সংখ্যা বাড়তে থাকে। আওয়ামী লীগের শেষ সময় পর্যন্ত ২১৫ জন ছিলেন। তখন অবশ্য বেঞ্চের সংখ্যাও বেড়েছিল। কিন্তু বেঞ্চের চেয়ে আইন কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি অনুপাতে বেড়েছে। তখন ৩/৪ জন ছিলেন প্রতিটি বেঞ্চে। পতিত সরকারের ১৬ বছরে নিযুক্ত সকল আইন কর্মকর্তাই ছিলেন আওয়ামী লীগ মানসিকতার। সরকারি দল ছাড়া ভিন্নমতের রাজনৈতিক দলের কাউকে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে নেওয়া হত না।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শরীফ ইউ আহমেদ ‘টাইমস’কে বলেন, ডিএজি একটি বেঞ্চে রাষ্ট্রের প্রধান প্রতিনিধি। তাকে অ্যাটর্নি জেনারেলের পক্ষে রাষ্ট্রের হয়ে রাষ্ট্রজড়িত সকল মামলার দেখাশোনা করতে হয়। আইন কর্মকর্তারা টিমওয়ার্কে কাজ করেন, মামলা নিষ্পত্তি ও নায়বিচারে ভূমিকা রাখেন। মামলার চাপ, মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী আইন কর্মকর্তা নিয়োগ হতে পারে।
তিনি বলেন, আইন অঙ্গনে বিশেষ করে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় এখনো ফ্যাসিস্টমুক্ত হয়নি। ফ্যাসিবাদের দোসরদের বাদ দিলে আইন কর্মকর্তাদের সংখ্যা এমনিতেই অনেক কমে যাবে।
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সুপ্রিম কোর্ট শাখার সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মনির হোসেন ‘টাইমস’কে বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে আইন কর্মকর্তা পদে বিপুল সংখ্যক আওয়ামী লীগ সমর্থকের নিয়োগের ঘটনা প্রমাণ করে আইন মন্ত্রণালয়ে এখনো ফ্যাসিস্ট রয়ে গেছে। তাই এ নিয়োগ হয়েছে।
সিনিয়র আইনজীবী জামিল আখতার এলাহী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আইন মন্ত্রণালয়ে ফ্যাসিবাদের ভূত রয়েছে, তাদের মাধ্যমে এসব নিয়োগ নিয়োগ হয়েছে। আইন কর্মকর্তা নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলেও তিনি মনে করেন।
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী কামরুল ইসলাম সজল ‘টাইমস’কে বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে প্রায় একশ’ ফ্যাসিবাদের দোসর রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের পরে তাদের নিয়োগ হলো কীভাবে? এতে মনে হয় সর্ষের মধ্যে ভূত রয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় এর দায় এড়াতে পারে না। ফ্যাসিবাদের দোসরদের অপসারণ করা না হলে কঠোর আন্দোলন শুরুর কথা জানান সজল।
এসব বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও আইন সচিব লিয়াকত আলী মোল্লাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।


