গণঅভ্যুত্থানের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলে খাবার খাবার খাইয়ে মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন একজনকে পিটিয়ে হত্যার যে ভিডিও দেশজুড়ে তোলপাড় ফেলেছিল, সেই ঘটনায় বিচারে কোনো অগ্রগতি নেই।
প্রথমে থানা পুলিশ, পরে তদন্ত সংস্থা পিবিআই আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর ২২ জনকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়ার প্রায় দুই মাসেও পুলিশ কাউকে ধরেনি। শাহবাগ থানার একজন কর্মকর্তা বলছেন, তিনি এর কিছুই জানেন না।
তবে আসামিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশ্যেই আছেন, তারা ক্লাস করছেন, হলে থাকছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ঘটনার পরপর যাদেরকে ধরা হয়েছিল, তাদের দুইজন এখন জামিনে।
সে সময়ের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ফেসবুকে একটি কবিতা পোস্ট করে লিখেছিলেন ‘অবশ্যই এই খুনের বিচার হবে।’। প্রায় দুই বছর পর এই বিষয়ে তার বক্তব্য পেতে তিন দিনে অন্তত ১০ বার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। তাকে হোয়াটস অ্যাপে প্রশ্ন লিখে জবাব চাইলেও উত্তর আসেনি।
৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে অন্যতম আলোচিত ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে তোফাজ্জল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা। ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগ এনে ধরা হয় এই যুবককে। মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন ওই যুবককে ক্রিকেট স্ট্যাম্প দিয়ে পেটানো হয়। দুই হাত পা বেঁধে স্ট্যাম্প দিয়ে মাড়ানো হয়। এর ফাঁকে আবার ডাল দিয়ে তাকে ভাত খাওয়ানো হয়।
তোলপাড় ফেলে দেওয়া সেই ঘটনার পর অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে আসে কড়া প্রতিক্রিয়া। হত্যার দুদিন পর আইন উপদেষ্টা একটি বৈঠক শেষে সাংবাদিকদেরকে বলেন, ‘বিষয়টি উপদেষ্টা পরিষদে আলোচনা হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ড আমাদের সবাইকে মর্মাহত করেছে। ইতোমধ্যে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এড়াতে সরকার সবরকম চেষ্টা করবে।’
১৯ সেপ্টেম্বর শাহবাগ থানায় মামলা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসের সুপারভাইজার মোহাম্মদ আমানুল্লাহ। ২৫ সেপ্টেম্বর নিহতের ফুফাতো বোন আসমা আক্তার ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্টসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে আরেকটি মামলা করেন। আদালত পরে দুটি মামলার তদন্ত একসঙ্গে করার নির্দেশ দেয়।
ঘটনার পরপরই ছয়জন শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন। এদের মধ্যে মো. আহসান উল্লাহ ওরফে বিপুল শেখ ও ওয়াজিবুল আলম জামিনে মুক্ত। বর্তমানে মো. জালাল মিয়া, আল হোসেন সাজ্জাদ, মোত্তাকিন সাকিন শাহ ও সুমন মিয়া কারাগারে।
গত বছরের ১ জানুয়ারি শাহবাগ থানার পরিদর্শক আসাদুজ্জামান ২১ জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র জমা দেন। পরে কয়েকজন আসামিকে অব্যাহতি দেওয়ার বিরুদ্ধে বাদীপক্ষ নারাজি দিলে আদালত অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের করা মামলার বাদী আমানুল্লাহ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘নারাজির পর আদালত পিবিআইকে অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব দেয়। পিবিআই তদন্ত শেষে ২৮ জনের নাম উল্লেখ করে প্রতিবেদন দেয়, যা আদালত গ্রহণ করে।’
গত ১০ মার্চ ২৮ জনের পিবিআইয়ের সম্পূরক অভিযোগপত্র গ্রহণ করে পলাতক ২২ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানার আদালত।
এরা হলেন: মো. ফিরোজ কবির, মো. আবদুস সামাদ, মো. সাকিব রায়হান, মো. ইয়াছিন আলী গাইন, মো. ইয়ামুজ্জামান, মো. ফজলে রাব্বি, শাহরিয়ার কবির শোভন, মো. মেহেদী হাসান ইমরান, মো. রাতুল হাসান, মো. সুলতান মিয়া, মো. নাসির উদ্দীন, মো. মোবাশ্বের বিল্লাহ, শিশির আহমেদ, মো. মহসিন উদ্দিন ওরফে শাফি, আবদুল্লাহিল কাফি, শেখ রমজান আলী রকি, মো. রাশেদ কামাল অনিক, মো. মনিরুজ্জামান সোহাগ, মো. আবু রায়হান, রেদোয়ানুর রহমান পারভেজ, রাব্বিকুল রিয়াদ ও মো. আশরাফ আলী মুন্সী।
কিন্তু এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। হল সংসদের নেতারা ও আবাসিক শিক্ষার্থীরা বলছেন, মামলার একাধিক আসামিকে এখনো বিশ্ববিদ্যালয় ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রকাশ্যে চলাফেরা করতে দেখা যায়।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত শেখ রমজান আলী রকি ২০২৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ছাত্রদলের মনোনীত প্যানেলের ভিপি প্রার্থী ছিলেন। তিনি ভূতত্ত্ব বিভাগের ২০১৭-১৮ সেশনের শিক্ষার্থী।
মো. রাশেদ কামাল অনিক ক্যাম্পাসেই আছেন, কথাও বলেছেন টাইমসের সঙ্গে। তিনি দাবি করেন, ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও তিনি হত্যায় জড়িত ছিলেন না।
হলেই থাকছেন এবং পুলিশ তাকে ধরতে কখনও আসেনি, এটি নিশ্চিত করে তিনি দাবি বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা প্রথমে সাতজনের নাম বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। তিনি তাদের একজন। ‘যাদের শিক্ষাবর্ষ চলছে, তারা তো এখনও হলেই আছে’, বলেন তিনি।
জানতে চাইলে শাহবাগ থানার এক কর্মকর্তা টাইমসকে বলেন, ‘মামলাটি আগের ওসি দেখতেন। তিনি এখন বদলি হয়ে গেছেন।’
গ্রেপ্তার কি বদলি হয়ে যাওয়া আগের ওসি এসে করে দেবেন?- এই প্রশ্নে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
পরে যোগাযোগ করা হলে ওসি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমার এত মুখস্ত নেই। আমি এসেছি দুই দিন আগে। এই বিষয়টা আমার অত জানা নাই।’
মামলা গোয়েন্দা বিভাগে জানিয়ে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে চাননি। সেই কর্মকর্তার মতো ওসিও বলেননি গ্রেপ্তারের দায়িত্ব তাদের কি না।
এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও আছে প্রশ্ন। ২০২৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী আট শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে অভিযোগপত্রে নাম আসা আসামিদের বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তৎকালীন প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের তদন্তে আটজনের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল, তাই তাদেরকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছিল।’
পিবিআইয়ের তদন্তে যাদের নাম এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে এখন কেন ব্যবস্থা নেননি- এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি তো দায়িত্বে নেই।’
ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্ট মো. ইলিয়াস আল-মামুন বলেন, ‘তোফাজ্জল হত্যাকাণ্ড নিয়ে যে প্রথম কথা এইটা হলো যে আমার আমলের কাহিনি না। এই বিষয়ে আসলে আগের প্রভোস্টরা ভালো বলতে পারবেন। আর দুই নম্বর হচ্ছে তোফাজ্জল হত্যাকাণ্ড নিয়ে বর্তমানে যা কিছু হচ্ছে, পুরোটাই ডিল করে প্রক্টর অফিস। সুতরাং আপনি প্রক্টর অফিসে কথা বললে সবচেয়ে ভালো তথ্য পাবেন।’
তবে বর্তমান প্রক্টর মো. ইসরাফিল প্রাং বলেন, ‘আমি অফিসের দায়িত্ব নিয়েছি কয়েকদিন আগে, বিষয়টি আগের প্রক্টর দেখেছেন। আমি দায়িত্ব কিছুটা গুছিয়ে নিয়ে বিষয়টি দেখব।’
২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগ তুলে তোফাজ্জলকে ফজলুল হক মুসলিম হলের গেস্টরুমে আটকে রাখে একদল শিক্ষার্থী। সেখানে তাকে নানা প্রশ্নের পাশাপাশি বেধড়ক মারধর করা হয়।
পরে মারধর থামিয়ে তাকে ক্যান্টিনে নিয়ে ভাত খাওয়ানো হয়। খাওয়ার পর আবার ক্রিকেট স্টাম্প ও বাঁশের লাঠি দিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়। একপর্যায়ে গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, তীব্র আঘাত ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে।
হৃদয়বিদারক এ ঘটনাটি লিওনার্দো দা ভিঞ্চির বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘দ্যা লাস্ট সাপার’ এর সঙ্গে তুলনা করে তুমুল সমালোচনা হয় সে সময়।


