ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম তীব্র ওঠানামার মধ্যে গত অর্থবছরে বাংলাদেশের পেট্রোলিয়াম আমদানির জন্য নতুন ঋণপত্র বা এলসি খোলা বেড়েছে ১৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, এ সময়ে জ্বালানি আমদানির এলসি দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলারে। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৯ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার। রোববার বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।
জ্বালানি আমদানির জন্য শুধু নতুন এলসিই বাড়েনি, আগের দায় পরিশোধেও বেশি ডলার গেছে। গত অর্থবছরে পেট্রোলিয়াম আমদানির এলসি নিষ্পত্তি ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ বেড়ে ১০ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ একদিকে পুরোনো আমদানির মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে, অন্যদিকে সামনে জ্বালানি আনার জন্য তার চেয়েও বেশি নতুন এলসি খোলা হয়েছে।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। যুদ্ধ শুরুর আগের দিন, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৭২ দশমিক ৪৮ ডলার। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। মার্চের শুরুতেই ব্রেন্টের স্পট মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং এপ্রিলের শেষ নাগাদ ১২৪ ডলার ছাড়ায়।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি কিনতে বেশি ডলার প্রয়োজন হয়েছে। কারণ, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে বিপুল জ্বালানি কিনতে হয়েছে।
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন পেট্রোলিয়ামের চাহিদার ৯৫ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে মেটাতে হয়। একই সঙ্গে দেশের মোট গ্যাসের চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশও আমদানিনির্ভর। বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার থেকে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেটা বলছে, মোট আমদানি এলসি খোলার প্রবৃদ্ধির তুলনায় জ্বালানি খাতে বৃদ্ধি ছিল অনেক বেশি। গত অর্থবছরে সব ধরনের আমদানির নতুন এলসি বেড়েছে প্রায় ৭ শতাংশ, সেখানে পেট্রোলিয়ামের এলসি বেড়েছে ১৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ। বিপরীতে মোট এলসি নিষ্পত্তি প্রায় অপরিবর্তিত ছিল।
এর অর্থ, বর্তমান ডলার পরিশোধের চাপের চেয়ে সামনে তৈরি হওয়া জ্বালানি আমদানির দায় দ্রুত বাড়ছে। নতুন খোলা এলসিগুলো পর্যায়ক্রমে নিষ্পত্তির সময় এলে ব্যাংকগুলোর ডলারের চাহিদা বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক তেলের দাম আবার ঊর্ধ্বমুখী হলে সেই চাপ আরও বাড়বে।
এদিকে গত অর্থবছরে দেশের মোট পণ্য আমদানিও প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে, অথচ রপ্তানি প্রায় স্থির ছিল। একই সময়ে চলতি হিসাবের ঘাটতিও বেড়েছে।
তবে আগের বছরের তুলনায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন শক্তিশালী। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিপিএম৬ হিসাবে ১২ আগস্ট রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার।
ফলে তাৎক্ষণিক সংকটের চেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার আবার চড়া হলে বাংলাদেশের বাড়তে থাকা জ্বালানি এলসির দায় সামনের মাসগুলোতে ডলার বাজারে কতটা নতুন চাপ তৈরি করবে।


