নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার তিয়শ্রী ইউনিয়নের একটি অনগ্রসর গ্রাম কুঠুরীকোণা। এখানকার অধিকাংশ মানুষ কৃষি নির্ভর ও দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করেন। তবে এ জনপদের মানুষের ভাগ্য বদলে যাওয়া শুরু করেছে কেবল তুষ আর হারিকেনের আলোয়। এই পরিবর্তনের রূপকার ইয়াসিন উল্লাহ নামের এক হাঁস খামারি। তার দেখানো পথে হাঁস পালন করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন এলাকার হাজারো মানুষ। গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠছে নতুন নতুন খামার।
১৯৭৫ সালের দিকে তুষ ও হারিকেন পদ্ধতিতে হাঁসের ডিম দিয়ে বাচ্চা ফোটানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করেন হাদিস উল্লাহ। তবে তিনি বাণিজ্যিকভাবে সফল হতে পারেননি। অকাল মৃত্যুতে তার উদ্ভাবিত সেই পদ্ধতি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।
এই হাদিস উল্লাহরই ছোট ভাই ইয়াসিন উল্লাহ। তিনি ১৯৯০ এর দশকে ভাইয়ের উদ্ভাবিত পদ্ধতি ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে সফল হন। তার সাফল্য দেখে বিভিন্ন এলাকা থেকেই তরুণরা ছুটে আসেন তার কাছে। তিনি নিজের স্বার্থের কথা ভুলে সবাইকে বিলিয়ে আসছেন এই জ্ঞান।
ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদনের এই পদ্ধতিটি খুবই সহজ, তবে সূক্ষ্ম নজর রাখতে হয়।
ইয়াসিন উল্লাহ বলেন, এই পদ্ধতিতে বাচ্চা উৎপাদনে বিদ্যুৎচালিত কোনো যন্ত্র লাগে না। প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো হলো ধানের তুষ, হারিকেন, বাঁশের চাটাই, লেপ, কম্বল, পুরোনো শাড়ি, বাঁশ ও কাঠের মতো সহজলভ্য সরঞ্জাম।

বিভিন্ন খামার থেকে সংগ্রহ করা ডিমগুলো বাছাই করে প্রথমে রোদে শুকানো হয়। এরপর ৪০ থেকে ৫০টা করে ডিম একেকটি লাল কাপড়ে বাঁধা হয়। ডিম ফোটানোর জন্য একটি কক্ষের ভেতর মাটির চুলার মতো বড় সিলিন্ডার বানানো হয়। সেই সিলিন্ডারে বিছানো থাকে তুষ। সিলিন্ডারগুলো একটার পাশে আরেকটা রাখা হয়। একেকটি সিলিন্ডারের ভেতর একবারে সাতশ থেকে এক হাজার ডিম রাখা হয়। সেখানে তাপ দেওয়া হয় হারিকেন ব্যবহার করে।
১৮ থেকে ২০ দিন সিলিন্ডারের ভেতরে থাকে ডিমগুলো। এই নির্ধারিত সময়ে হারিকেন অদল-বদল করতে হয়। এরপর সেখান থেকে বের করে ডিমগুলো বিছানার ওপর রাখা হয়। সেই বিছানার নিচে থাকে তুষ আর ওপরে থাকে কাঁথা-কম্বল। আরও ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে শুরু করে।
এভাবে ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদনের হার শতকরা ৮০ থেকে ৯০টি বলে জানান ইয়াসিন। ইলেকট্রিক ইনকিউবিটরেও শতকরা ৭৫ থেকে ৯০ শতাংশ ডিমে বাচ্চা পাওয়া যায়।
বিদ্যুৎ খরচ না থাকায় এবং জ্বালানি খরচ সীমিত হওয়ায় ইয়াসিনের এই পদ্ধতির কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও লোকমুখে দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের খামারিরা তো বটেই, ভারত থেকেও প্রায় ৫০০ জন নারী-পুরুষ তার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। অন্যকে শেখালে ব্যবসার ক্ষতি হবে—এমন সংকীর্ণ ভাবনা ইয়াসিনের নেই। তিনি বিনা স্বার্থে সবাইকে এই কৌশল শিখিয়ে চলেছেন।
তার এই অভাবনীয় সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট তাকে ‘প্রশিক্ষক’-এর মর্যাদা দিয়েছে।
টাইমস অব বাংলাদেশকে ইয়াসিন বলেন, ‘আমি নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি নারী-পুরুষদের হাঁস-মুরগি পালনে উদ্বুদ্ধ করে লক্ষাধিক মানুষের বেকার সমস্যার সমাধান করেছি। এটা ভাবলেই আমার গর্ব হয়।’

নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক, প্রাণিসম্পদ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সংবাদকর্মীরা তার এই অভিনব পদ্ধতি দেখতে ছুটে এসেছেন।
তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে শ্রেষ্ঠ সফল ও বিশেষ উদ্যোক্তা হিসেবে ক্রেস্ট, সার্টিফিকেট দিয়ে উৎসাহিত করেছেন। এতে করে আমি অত্যাধিক আনন্দ পাই, পাশাপাশি কাজের আগ্রহ হাজার গুণ বেড়ে যায়।’
তিনি বলেন, ‘প্রশিক্ষণ চলমান রেখে আমি এক দিন বয়স থেকে বিভিন্ন বয়সের হাঁস ও হাঁসের বাচ্চা সারা দেশেই সরবরাহ করি।’
ইয়াসিনের এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন নেত্রকোনার জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম। তিনি জানান, হাঁস খামারিদের সব ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। দিন দিন খামারির সংখ্যা বাড়তে থাকায় এলাকায় একটি আদর্শ খামার গড়তে শেডিং ইউনিট নির্মাণসহ অন্যান্য আধুনিক কৌশল শেখানোরও আশ্বাস দেন এই কর্মকর্তা।


