তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আকাশপথের নিরাপত্তায় অস্বাভাবিক তোড়জোড় ও বিমান বদলের নেপথ্যে ছিল ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা। মূলত তেহরান-ওয়াশিংটন আলোচনা ভণ্ডুল এবং এরদোয়ানের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা নষ্ট করতেই ইসরায়েল এই ছক এঁকেছিল বলে মনে করছেন তুর্কি কর্মকর্তারা। মঙ্গলবার এমন খবর প্রকাশ করেছে মিডল ইস্ট আই।
গত মাসে আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেশে ফেরা নিয়ে নজিরবিহীন লুকোচুরি এবং তাকে বহনকারী এয়ারফোর্স ওয়ানে ইরানের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা নিয়ে নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আঙ্কারা বিমানবন্দরে প্রথমে এয়ারফোর্স ওয়ানে ওঠে গোপনে সেই বিমান থেকে অন্য বিমানে চলে যান ট্রাম্প। আর বিমান বদল করতে তাকে সাধারণ ক্যাটারিং ট্রাকে তোলেন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিকিউরিটি টিম ইরানের দিক থেকে সম্ভাব্য হামলার তথ্য পেয়ে নজিরবিহীন এই ব্যবস্থা করে।
তুর্কি কর্মকর্তাদের ধারণা, ইসরায়েলি গোয়েন্দারাই মার্কিন গোয়েন্দাদেরকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর সম্ভাব্য হামলার এই ‘ভুয়া’ তথ্য দিয়েছিল। তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের আলোচনা পণ্ড করাই ছিল ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের এই নাটকের মূল উদ্দেশ্য।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু চেয়েছিলেন ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংলাপ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাক। কারণ, ইসরায়েল চায় যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার বদলে ইরানের উপর সামরিক হামলা ও দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংসের অভিযান অব্যাহত রাখুক। সেই সাথে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ককে দুর্বল করাও ছিল ইসরায়েলের এই চক্রান্তের অন্যতম লক্ষ্য।
আঙ্কারা বিমানবন্দরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ও অবরুদ্ধ পরিস্থিতি
ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন ঘিরে গত ৭ ও ৮ জুলাই আঙ্কারায় কঠোর নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়। সড়ক বন্ধ, ফুটপাতে চলাচল সীমিত এবং সরকারি কর্মচারীদের এক সপ্তাহের প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠিয়ে শহরটি প্রায় জনশূন্য করে ফেলা হয়েছিল। তুর্কি সরকার আঙ্কারা বিমানবন্দরকে বিশেষভাবে প্রস্তুত রেখেছিল, যাতে বিশ্বনেতারা মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে শীর্ষ সম্মেলনের ভেন্যুতে পৌঁছাতে পারেন।
এমন কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যেই ৮ জুলাই বেলা প্রায় ২টার দিকে আঙ্কারা বিমানবন্দরে তুরস্কের নিরাপত্তা বাহিনীর অস্বাভাবিক অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়। মার্কিন কর্মকর্তারা তুর্কি কর্তৃপক্ষকে জানান, তারা ইসরায়েলের কাছ থেকে একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন পেয়েছেন, যেখানে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে ট্রাম্পের ওপর হামলা চালাতে পারে ইরান।
ম্যানপ্যাডস হামলার তথ্য ও গোপনে বিমান বদল
ইসরায়েলি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছিল, ইরানের একটি গোপন অভিযান পরিচালনাকারী ইউনিট আঙ্কারা বিমানবন্দরের মাত্র ৫০০ মিটার থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থান নিয়ে ‘ম্যানপ্যাডস’ নামে পরিচিত কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ট্রাম্পকে বহনকারী বিমান এয়ারফোর্স ওয়ানে হামলা চালাতে পারে।
আঙ্কারা বিমানবন্দরের বিপরীতে চারপাশে অসংখ্য বেসামরিক স্থাপনা থাকায় তুর্কি কর্মকর্তারা এবং মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস চরম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে ও বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। প্রথমত, তারা ট্রাম্পের যাত্রার স্থান আঙ্কারা বিমানবন্দর থেকে সরিয়ে দূরের এসেনবোয়া বিমানবন্দরে স্থানান্তর করেন, যেখানে বিমানবন্দরের সীমানা থেকে বেসামরিক ভবনগুলো তুলনামূলকভাবে দূরে অবস্থিত।
এরপর তারা আঙ্কারায় অত্যন্ত গোপনীয়তায় সাধারণ ক্যাটারিং ট্রাকে করে ট্রাম্পকে এক বিমান থেকে অন্য বিমানে স্থানান্তর করেন। সবশেষে তারা নতুন এয়ারফোর্স ওয়ান বিমানটির বদলে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ান ফিরিয়ে আনেন, কারণ পুরোনো ওই উড়োজাহাজে এমন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বা অ্যান্টি-মিসাইল সিস্টেম রয়েছে যা নতুনটিতে এখনো যুক্ত করা হয়নি।
ট্রাম্পের শান্তি উদ্যোগ ও নেতানিয়াহুর বিপরীত মেরু
মার্কিন কর্মকর্তারা ইসরায়েলের এই হুমকিকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করার মূল কারণ ছিল এর সময়কাল। ট্রাম্প ঠিক ওই স্পর্শকাতর সময়েই সংঘাত শেষ করা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে ইরানের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে বৈঠকের সময়ও ট্রাম্প বারবার বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে এবং তিনি চলমান আলোচনার ব্যাপারে আশাবাদী।
তবে ট্রাম্পের এই অবস্থান ও এরদোয়ানের সঙ্গে গড়ে ওঠা ইতিবাচক সমীকরণ ছিল ইসরায়েলি উদ্দেশ্যের পুরোপুরি বিপরীত। তাই তুর্কি কর্মকর্তারা মনে করেন, ইসরায়েলি গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি ছিল নেতানিয়াহু সরকারের একটি কৌশল। এর মাধ্যমে ইসরায়েল নিজেদের ট্রাম্পের পরম রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করে একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বিপক্ষীয় শান্তি চুক্তি ভেস্তে দেওয়ার চক্রান্ত বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল।


