বাংলাদেশের আধুনিক গানের জগতে যে ক’জন কণ্ঠশিল্পী দীর্ঘ সময় ধরে শ্রোতার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন, কনক চাপা তাদের অন্যতম। ১১ সেপ্টেম্বর তার সংগীত ক্যারিয়ারের ৩৫ বছর পূর্ণ হলো। একই সঙ্গে তিনি উদযাপন করছেন জন্মদিনও।
কনক চাপার জন্ম ময়মনসিংহে। ছোটবেলা থেকেই গান ছিল তার নেশা। শৈশবে পরিবার থেকে উৎসাহ পেয়েই সংগীতশিক্ষা শুরু করেন। নাচ-অভিনয়ে নয়, তিনি পুরোপুরি ডুবে যান গানে। পল্লীগীতি, নজরুলসংগীত, আধুনিক গান—সবক্ষেত্রেই হাতেখড়ি হয়েছিল তার। ৮০ দশকের শেষভাগে তিনি রেডিও ও টেলিভিশনে নিয়মিত গাইতে শুরু করেন। সেই সময় থেকেই শ্রোতাদের নজরে আসেন তিনি।
৯০ দশকের শুরুর দিকে বাংলা চলচ্চিত্রের গানে প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে কনক চাপার অভিষেক ঘটে। খুব অল্প সময়েই তার কণ্ঠ ভিন্ন এক আবেদন সৃষ্টি করে। গায়ক কুমার বিশ্বজিৎ, আসিফ আকবর কিংবা হিমাংশুর সঙ্গে দ্বৈত গানে তিনি জনপ্রিয়তা পান। ‘তুমি আমার প্রথম প্রেম’, ‘এই পথে এই চেনা পথে’, ‘তুমি ছাড়া আমি যেন শূন্য’—এমন অসংখ্য গান তার কণ্ঠে অমর হয়ে গেছে।
বাংলাদেশের সংগীতের স্বর্ণযুগ বলা হয় নব্বইয়ের দশক ও দুই হাজার সালের শুরুটাকে। সে সময় অডিও অ্যালবামের বাজার জমজমাট ছিল। কনক চাপা নিজের একক ও মিশ্র অ্যালবামে অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দেন। আধুনিক গানের পাশাপাশি তিনি লোকগানেও নিজেকে সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ফলে শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গাতেই তার কণ্ঠ পৌঁছে গেছে।
শুধু অডিও নয়, টেলিভিশন ও মঞ্চেও কনক চাপা সমান জনপ্রিয়। দেশের ভেতরে তো বটেই, প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যেও তিনি অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন শিল্পী। ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য—সব জায়গায় তিনি অসংখ্য কনসার্ট করেছেন। তার প্রাণবন্ত গায়কী আর সহজ-সরল উপস্থিতি দর্শকের কাছে আলাদা মাত্রা এনে দেয়।
গান গাওয়ার পাশাপাশি কনক চাপা নিয়মিত নতুন শিল্পীদের উৎসাহ দেন। সংগীত নিয়ে নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তার উপস্থিতি চোখে পড়ে। একসময় রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি, তবে গানই তার মূল পরিচয়।
ব্যক্তিজীবনে তিনি একজন সফল গৃহিণী ও মা। সংসার, সন্তান এবং সংগীত—সবকিছুই তিনি সামঞ্জস্য রেখে চালিয়ে গেছেন। তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি জাতীয় পুরস্কার না পেলেও, অসংখ্য জনপ্রিয়তা, শ্রোতার ভালোবাসা ও সম্মাননা পেয়েছেন।
কনক চাপার সংগীতযাত্রা মানে একাধারে তিন প্রজন্মের শ্রোতাদের সঙ্গ পাওয়া। নব্বই দশকের কিশোরেরা যেমন তার গানে মুগ্ধ হয়েছে, আজকের তরুণ শ্রোতারাও তার গান শুনে অনুপ্রাণিত হয়। জন্মদিনের এই বিশেষ সময়ে তিনি নিজেও বলেছেন, ‘আমার আসল পুরস্কার হলো মানুষের ভালোবাসা।’
বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে কনক চাপার অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। একটানা ৩৫ বছর ধরে তিনি শ্রোতাদের মুগ্ধ করে আসছেন। তার জন্মদিন মানে কেবল একটি ব্যক্তিগত দিন নয়, বরং আমাদের সংগীত-সংস্কৃতির ইতিহাসে একটি আনন্দের দিন। তিনি প্রমাণ করেছেন—ভালো গান, নিষ্ঠা আর ধৈর্য থাকলে একজন শিল্পী প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শ্রোতার হৃদয়ে বেঁচে থাকতে পারেন।


