প্রায় সাত বছর পর আমি আবার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিলাম। শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সঙ্গে সাংবাদিকদের মতবিনিময় সভা ছিল সেটি। অনুষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল শুধু এই কারণে নয় যে, তারেককে বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ধরা হচ্ছে, বরং এ কারণেও যে এটি আগামী দিনগুলোতে ক্ষমতা ও গণমাধ্যমের সম্পর্ক কেমন হতে পারে, তার একটি ইঙ্গিত দিয়েছে।
দেশের কয়েকজন কঠোর সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে যেভাবে তিনি সামলেছেন, তাতে আমি মুগ্ধ হয়েছি। শান্ত, সংযত ও স্পষ্টভাষী তারেক রহমান তার রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছেন। তবে অনুষ্ঠান শেষে এক ধরনের অস্বস্তি বোধ করেছি। যে বিষয়টি আমাকে বিচলিত করেছে, তা তারেকের আচরণ নয়, বরং তার চারপাশে থাকা বহু সাংবাদিকের আচরণ।
লক্ষ্য করলাম, পরিচিত ও বিপজ্জনক একটি প্রবণতা আবার দেখা দিচ্ছে। সেটি হলো ক্ষমতাবান একজনকে ঘিরে প্রশংসা ও তোষামোদকারী সাংবাদিকদের একটি নতুন বলয় তৈরি হওয়া–ঠিক যেমনটি একসময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চারপাশে গড়ে উঠেছিল।
সাংবাদিকতা যখন চিয়ারলিডিং
শেখ হাসিনার দেড় দশকেরও বেশি শাসনামলে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ তাদের পেশাগত দায়িত্ব থেকে সরে গিয়েছিল। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার বদলে বহু সাংবাদিক প্রকাশ্যেই ক্ষমতাবানদের রক্ষা করেছেন। তারা সরকারি বয়ান জোরালোভাবে প্রচার করেছেন, সমালোচকদের হেয় করেছেন এবং স্বাধীন পেশাজীবীর চেয়ে দলীয় ক্যাডারের মতো আচরণ করেছেন।
শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনগুলো প্রায়ই ‘প্রশংসা সম্মেলনে’ পরিণত হতো। সেগুলো ছিল প্রশ্নের জায়গায় কীভাবে প্রশংসা করা যায়, তার এক বড় উদাহরণ। এর পরিণতি ছিল ভয়াবহ। সাংবাদিকতা তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। গণমাধ্যমের ওপর জনআস্থা কমে যায়। ফলে প্রধানমন্ত্রী নিজেও বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। করতালি ও তোষামোদের বেষ্টনীতে আবদ্ধ হয়ে থাকায় তিনি জনগণের ক্ষোভ, প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়, দুর্নীতি ও দমন–পীড়নের মতো অস্বস্তিকর সত্য থেকে আড়ালেই ছিলেন।
তার পতন ঘটেছে। কারণ, তিনি ভিন্নমত শোনা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সত্য লুকানো বা বিকৃতির মূল্য সাংবাদিকতা ও হাসিনা-উভয়কেই দিতে হয়েছে।
তোষামোদের মূল্য
তোষামোদ করার মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা নগ্নভাবে প্রকাশ পায় জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় ও তার পরপরই। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বহু সাংবাদিক ও গণমাধ্যম হামলার মুখে পড়ে। সংবাদকক্ষ ভাঙচুর করা হয়। সাংবাদিকদের হয়রানি করা হয়। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান হুমকির মুখে পড়ে। সাংবাদিকদের ওপর সহিংসতা কোনোভাবেই কাম্য নয়, তবে এই জনরোষ এমনি এমনি সৃষ্টি হয়নি।
বছরের পর বছর ধরে গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ সরকারের তাবেদার হিসেবে কাজ করেছে। তারা দমন–পীড়নকে বৈধতা দিয়েছে, ভিন্নমত উড়িয়ে দিয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবেদন প্রকাশ থেকে বিরত থেকেছে এবং বিরোধী কণ্ঠকে কলঙ্কিত করেছে। রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব নড়বড়ে হয়ে পড়তেই সেই জমে থাকা ক্ষোভ সংবাদমাধ্যমের দিকেই ফিরে আসে।
শেখ হাসিনার পতনের পরও সাংবাদিকতা তার কলুষিত ভাবমূর্তি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আস্থা ফিরে আসেনি। বহু সম্পাদক, মালিক ও সাংবাদিক নিজেদের ভূমিকার জন্য আত্মসমালোচনা না করে এবং হাসিনার আমলে কর্তৃত্ববাদকে বৈধতা দেওয়ার দায় স্বীকার না করে কেবল আনুগত্য বদলেছেন। তাদের অপকর্মের ফল আজও সাংবাদিকতা বহন করছে।
তারেককে ঘিরে সতর্ক সংকেত
তারেক রহমানের সঙ্গে ওই বৈঠকে আমি অতীতের বিপজ্জনক প্রতিধ্বনি টের পেয়েছি। বহু সাংবাদিক কঠিন প্রশ্ন করার চেয়ে কাছাকাছি যাওয়ার আগ্রহে বেশি তৎপর ছিলেন। আমন্ত্রণ পাওয়ার উত্তেজনা চোখে পড়ছিল। কেউ কেউ প্রকাশ্যেই তারেককে ‘ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী’ বলে প্রশংসা করেছেন।
পেশাগত সীমারেখা ভেঙে সভা শেষ হতেই অনেকেই করমর্দন ও ছবি তোলার জন্য তার চারপাশে ভিড় করেন। এটি সাংবাদিকদের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতার যোগাযোগের চেয়ে বেশি একটি ভক্তসমাবেশের মতো মনে হয়েছে। তবে কেউ কেউ আলাদা ছিলেন। নিউ এজ-এর সম্পাদক নুরুল কবিরের মতো সাংবাদিকরা দেখিয়েছেন—দৃঢ়, স্বাধীন এবং ক্ষমতার মোহমুক্ত হয়ে সাংবাদিকদের কেমন আচরণ করা উচিত।
তোষামোদী সাংবাদিকতার ঝুঁকি
প্রকৃতপক্ষে তোষামোদী সাংবাদিকরা রাজনীতিবিদদের মিত্র নন, বরং বোঝা। তারা বাস্তবতা ছেঁকে দেয়, জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেখায়, অসন্তোষকে খাটো করে এবং সমালোচনাকে শত্রুতা ও ভিন্নমতকে ষড়যন্ত্রে রূপ দেয়। এদের ঘিরে থাকা নেতারা সঠিক তথ্য পান না।
এর ফলে রাজনীতিবিদরা ভুল সিদ্ধান্ত নেন। জনক্ষোভ তাদের চোখ এড়িয়ে যায়—যতক্ষণ না তা বিস্ফোরিত হয়। শেখ হাসিনার অভিজ্ঞতা এর বড় উদাহরণ। তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল বিরোধী চাপ নয়, বরং বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতা, যার একটি বড় অংশ তৈরি হয়েছিল প্রশংসাকে সত্যের ওপরে স্থান দেওয়া সাংবাদিকদের মাধ্যমে।
সাংবাদিকতার সীমারেখা আছে
পেশাগত কারণে সাংবাদিকদের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেই হয়। কিন্তু তার সীমানা আছে, যা কখনো অতিক্রম করা যাবে না। আমরা প্রশ্ন করি, বিতর্ক করি, সাফল্য স্বীকার করি এবং ব্যর্থতা উন্মোচন করি।
সাংবাদিকরা ভক্ত নন, প্রচারক নন। আমাদের দায়িত্ব শাসকের সেবা করা নয়, নাগরিকদের সঠিক তথ্য দেওয়া। যখন সাংবাদিকরা এই সীমা লঙ্ঘন করেন, তখন দুর্নীতি বাড়ে, প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত জনরোষ রাষ্ট্র ও গণমাধ্যম—উভয়ের দিকেই ধেয়ে আসে।
তারেক রহমান এখন নেতৃত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখোমুখি। বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিতে হলে তাকে সক্রিয়ভাবে তোষামোদ পরিত্যাগ করতে হবে। পেশাগত সমালোচনা ও সুযোগসন্ধানী প্রশংসার পার্থক্য বুঝতে হবে।
ভবিষ্যতের জন্য করণীয়
বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তারেক রহমান যদি প্রধানমন্ত্রী হন, তবে তিনি একটি ক্ষতবিক্ষত রাষ্ট্র উত্তরাধিকার হিসেবে পাবেন। এমন একটি দেশ শাসনের জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ও বাধাহীন সত্য।
গণমাধ্যমের জন্যও এটি এক ধরনের পরীক্ষা। তারা হয় প্রহরীর ভূমিকায় ফিরবে, নয়তো আবার ক্ষমতার অনুষঙ্গে পরিণত হবে। আগামীতে নতুন সরকারের আমলে পুরোনো ভুল করা যাবে না। ভুলের পুনরাবৃত্তি হলে বড় মাশুল দিতে হবে।
শেখ হাসিনার পতন কেবল একটি রাজনৈতিক বিপর্যয় ছিল না; এটি ছিল রাজনীতি, প্রতিষ্ঠান ও সাংবাদিকতাকে ঘিরে এক সার্বিক ব্যর্থতা। চিন্তার বিষয় হলো, ওইসব সংকেত ধীরে ধীরে আবার দৃশ্যমান হচ্ছে।


