জুবায়ের তানিন, আবু ধাবি থেকে
৩৬ হাজার ফুট উঁচু থেকে পৃথিবী দেখার সুযোগ তো হরহামেশা আসে না। যদি না আপনি বিমানে চড়েন। এই সুযোগটা করে দিল এশিয়া কাপ। দেশের আকাশসীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার পর ওপর থেকে মেঘ আর বিস্তীর্ণ আকাশ ছাড়া কিছু দেখা যায়নি। সহযাত্রী ও সহকর্মীর ধাক্কায় ঘুম ভাঙতেই শুনতে পেলাম, বুর্জ খলিফার কথা। পাইলটও এনাউন্স করলেন, ‘কিছুক্ষণের’ মধ্যেই দুবাই আন্তর্জাতিক বিমাবন্দরে অবতরণের কথা। একটু নড়েচড়ে বসেও অবশ্য জানালা দিয়ে তাকিয়ে সুবিধা করে উঠতে পারিনি। অবতল লেন্সের আড়ালে থাকা মায়োপিয়ায় আক্রান্ত চোখ কেবল মেঘ ফুঁড়ে আসা সূর্যের আলোতে ধাধিয়েছে।
দুবাইয়ের আকাশ সীমায় প্রবেশের সাথেসাথেই অবশ্য নিচের দিকে নজর গেল। পারসিয়ান গালফের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে থাকলেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিশাল একটা অংশ জুড়ে আছে আরব সাগরের সাথে। অবশ্য আরব সাগরের সেই বিশালত্ব খুব বেশি নেই। মরু আর সাগরের বুক চিড়ে দুবাই শহরের বিভিন্ন অংশে গড়ে উঠছে আইল্যান্ড। বাংলাদেশের হাওর কিংবা নদী বিধৌত এলাকাগুলোতে যেমনটা দেখা যায়, গুচ্ছ ঘরবাড়ি। পার্থক্য অবশ্য আছে এই দুইয়ে, দুবাইয়ের দ্বীপগুলো গড়ে উঠছে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে। আমাদের দেশের নদী কিংবা উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মান কেমন সেটা নিশ্চয়ই আপনার অজানা নয়!

৯ সেপ্টেম্বর পর্দা উঠেছে এবারের এশিয়া কাপের। গ্রুপ রাউন্ডে বাংলাদেশের সব ম্যাচের ভেন্যু রাজধানী আবু ধাবিতে। যদি সুপার ফোর নিশ্চিত করতে পারে তাহলে আবার দুবাইয়ে ফেরা হবে দলের সাথে, নইলে দলকে ছাড়া। প্রথম তিন ম্যাচে প্রতিপক্ষ হংকং, আফগানিস্তান ও শ্রীলংকা।
ট্যাক্সি করে দুবাইতে রওনা হওয়ার আগে অবশ্য এই দেশের গরমের সাথে শরীর কুলিয়ে উঠতে পারেনি। বাংলাদেশেও বেশ গরম, তবে এখানকার গরমে যেন অন্য কিছু আছে। শরীরের চামড়া পুড়ে যাওয়ার যোগাড়। এটা লিখেই দেয়া যায়, বাংলাদেশের কেউ যদি প্রথমবার সংযুক্ত আরব আমিরাতে পা রাখে, তাহলে দেশের গরম নিয়ে অভিযোগ করা বন্ধ করে দেবে। ট্যাক্সির এয়ারকন্ডিশনের ছোঁয়ায় অবশ্য গরম নিয়ে ভাবনা আপনি দূরেই রাখতে পারবেন। দুবাই থেকে আবু ধাবির ১৪০ কিলোমিটার পথে গরমের প্রকোপ থেকে তো অন্তত রক্ষা পাবেন।
দীর্ঘ এই পথ মসৃণ, নেই কোনো খানাখন্দ, ভাঙা। ধাক্কা অল্পবিস্তর যা লাগবে, সেটা গাড়ি লেন চেঞ্জ করার সময়ই। অবশ্য ভালো সাসপেনশনের জন্য সেসব একেবারেই গায়ে লাগবে না। তবে আপনার চোখ বিষিয়ে উঠতে পারে দুইপাশে ধুসর প্রান্তর আর বড় বড় বিল্ডিং দেখে। দুবাই থেকে যতই আবুধাবির দিকে এগোবেন, ততই চেপে বসবে এসব দৃশ্য। পুরো দেশটাই যেখানে মরুভূমির ওপর দাঁড়িয়ে, সেখানে সবুজ আশা করাটাও বাড়াবাড়িই বটে। তবে আপনি বাংলাদেশি হলে, এই চাওয়াতে খুব একটা ভুলও নেই। সবুজে অভ্যস্ত চোখ, হুট করে দালান আর মরুভূমি দেখা ক্লান্ত হওয়াটাও অযৌক্তিক নয়।

এক্সপ্রেসওয়ের দুই পাশেই চোখে পড়বে আরব আমিরাতের বেশ কিছু সরকারি-বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। আবু ধাবির হেরিটেজ কার্যালয়, খলিফা ইউনিভার্সিটি, মিউনিসিপালিটি পার্ক-সহ আরো বেশ কিছু জিনিসই আপনার নজর কাড়বে। দালানের রঙ, গঠন কিংবা কারুকার্যে কোনো ত্রুটি নেই। কিন্তু তবুও যেন সবকিছু প্রাণহীণ সবকিছু। তবুও এর মাঝেই চলছে সব আপন গতিতে। তবে আবুধাবিতে ঢোকার আগে থামতে হয়েছিল মিনিট কয়েকের জন্য, গাড়ির দুর্ঘটনায়। এসইউভির সাথে নাম না জানা ব্র্যান্ডের কারের সংঘর্ষ। যদিও হতাহতদের খোঁজ নেয়ার সুযোগ হয়নি।
হোটেলে চেকইন করে অবশ্য দল ফেলার জো নেই। বাংলাদেশ দল অনুশীলন করবে জায়েদ স্টেডিয়ামের ওভাল ওয়ানে। সেটা ধরতেই ব্যাগ রেখেই ফের দৌড়। টুর্নামেন্ট শুরুর দিনে পৌছেছি, এক্রিডিটিশন পেতে তাই আরেকটু দেরি। এসিসির মিডিয়া ম্যানেজার, দেশের ক্রিকেট পাড়ার প্রথিতযশা এক সিনিয়র সাংবাদিকের তদবিরে অবশ্য গা জ্বলানো গরমে মাঠের বাইরে মিনিট দশেকের বেশি দাঁড়িয়ে থাকতে হয়নি। অবশ্য পাড় ক্রিকেট ভক্ত হলে হতাশ হবেন। এশিয়া কাপের মতো বড় একটা টুর্নামেন্ট হচ্ছে, অথচ গোটা শহরের তাতে নেই কোনো ভ্রুক্ষেপ। আয়োজন যা আছে, সব মাঠকেন্দ্রিক।

বাংলাদেশ দলের অনুশীলন দেখার সুযোগ হলো খুব কাছে থেকে। একেকজনের মারা শটের পর বল উড়ে আসছিল মাথার ওপর। যদিও গরমে সবাই নাজেহাল। ৩৬ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা হলেও আসলে অনুভূত হচ্ছিল ৫৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস! অবশ্য কিছু করারও নেই। এই গরমকে মাথায় করেই বাংলাদেশের কত প্রবাসী শ্রমিক এখানে কন্সট্রাকশন সাইটগুলোতে কাজ করে, ঘাম ঝরান, দেশে রেমিটেন্স পাঠান। কেবল নিজের পরিবারের মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটাবেন বলে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে এই প্রবাসীদের একটা বড় অংশই মাঠে আসবেন বাংলাদেশের হয়ে গলা ফাটাতে। এবার লিটন দাস-তাসকিন আহমেদদের কাছেও তাদের চাওয়া, এই তপ্ত মরুর বুকে হাসি নিয়ে যেন বাড়ি ফিরতে পারেন।


